রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) পরিকল্পনা উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (ভা.) জনাব আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। প্রকল্প পরিচালনায় অজ্ঞতা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন, বিল-ভাউচারে ডাবল ক্লেইম দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্নসাৎসহ কি নেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ।
এসব অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরও দৌরাত্ন্য থামছে না আবদুল গফুরের। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে দলবল নিয়ে ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে মিলেছে পাহাড়সম দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য। এরমধ্যে চাকরিতে নিয়োগের জালিয়াতির তথ্য ‘চোখ কপালে উঠার মতো’।
সূত্র জানায়, অনিয়ম-দূর্নীতির দায়ে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পিডি আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলমান রাখতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল আলমকে প্রকল্প পরিচালক ও দুই সহযোগী অধ্যাপককে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়।
রাবিপ্রবির ভারপ্রাপ্ত রেজিষ্টার মো. জুনাইদ কবির গত ৪ মে সোমবার এই আদেশপত্রে স্বাক্ষর করেন। আদেশপত্র অনুযায়ী দায়িত্বগ্রহণের চেষ্টা করা হলে আবদুল গফুর ছাত্রদল পরিচয়ে কতিপয় বিপথগামী ছাত্র ও বহিরাগত লোকজন নিয়ে ৫ মে মঙ্গলবার সকালে ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কাজে ঢাকায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আতিয়ার রহমান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভিসি আতিয়ার রহমান মঙ্গলবার দিনগত রাত সাড়ে ৮টায় দৈনিক ঈশানকে বলেন, আবদুল গফুর ছাত্রদল পরিচয়ে বহিরাগত কিছু লোক নিয়ে কার্যালয়ে তালা দেওয়ার কথা শুনেছি। এই সময় আমি ছিলাম না, দাপ্তরিক কাজে আমি ঢাকায় ছিলাম। এখনো আছি। আবদুল গফুরের এসব কাজ সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত। কারণ তিনি বহিস্কৃত। এ অবস্থায় তিনি এ কাজ করতে পারেন না।
আবদুল গফুর এসব কেন করছেন জানতে চাইলে ভিসি ড. আতিয়ার রহমান বলেন, আবদুল গফুর আপাদমস্তক একজন করাফটেড লোক। ভারপ্রাপ্ত পিডি থাকা অবস্থায় তিনি সীমাহীন দূর্নীতি করেছেন। ইন্টেরিম সরকারের সময় তিনি নিয়োগে অনিয়ম করে ভারপ্রাপ্ত পিডি হয়েছিলেন। অনিয়ম ঠেকাতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ কারণে আবদুল গফুর আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে এক কেটি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। যার লোভের বশবর্তী হয়ে ছাত্রদলের নেতা পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন-চারজন শিক্ষার্থী বহিরাগত ১০-১২ জন লোক নিয়ে হুমকি ধমকি দিচ্ছে। তারা আবদুল গফুরের বহিষ্কার আদেশ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তাদের নিয়ে আবদুল গফুর মঙ্গলবার সকালে আমার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
চাকরিতে নিয়োগে অনিয়ম:
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টারের তথ্যমতে, আবদুল গফুর শিক্ষা জীবনে দু'টি তৃতীয় বিভাগ থাকা এবং পূর্বে সরকারি,আধা সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরির অভিজ্ঞতা না থাকা সত্বেও ২০১৭ সালের ১০ জুলাই সরাসরি ৭ম গ্রেডে সহকারী পরিচালক পদে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরে যোগদান করেন। যেখানে ২০তম গ্রেডে যোগদান করতে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়, সেখানে ৭ম গ্রেডে যোগদান বিস্ময়কর।
এছাড়া বয়সসীমা ৩৫ অতিক্রম করলেও সব বাঁধা পার হয়ে যান তৎকালীন রেজিস্ট্রার জনাব অন্জন কুমার চাকমা'র সাথে ৭ লাখ টাকা লেনদেনের বিনিময়ে। একইসাথে নিয়োগ বিধান অনুযায়ী ১ জন প্রার্থী নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ৩ জন প্রার্থী অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ভাইবাতে শুধুমাত্র ২ জন প্রার্থীর অংশগ্রহণেই নিয়োগ হয় আবদুল গফুরের।
সরকারি অর্থ ডাবল ক্লেইম করা:
নথির তথ্যমতে, ট্রেনিং কিংবা মিটিং এর কাজে ঢাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ করে কর্মচারীদের নামে অগৃম উত্তোলন করে পরবর্তীতে প্রত্যার্পন নেওয়া ছাড়াও ডিএ নিতেন তিনি। একটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর একদিনের ট্রেনিং এর জন্য একজন কর্মচারীর নামে ২৫ হাজার টাকা অগৃম উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও তিনি একই প্রশিক্ষণে যেতে নিয়েছেন ডিএ বিল। কর্মচারীর নামে অগৃম গ্রহণ, একই অর্থ ডাবল ক্লেইম করেন তিনি। যে কর্মচারীর নামে অগৃম এবং প্রত্যার্পন নেওয়া হয় উক্ত প্রশিক্ষণে তিনি যাননি এবং তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ ও ছিলো না। পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর এই বিলের প্রত্যার্পন নেওয়া হয়।
আরেকটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়,একজনের নামে অগৃম নেওয়া হয়েছে কিন্তু যার নামে নেওয়া হয়েছে নথিতে তাঁর স্বাক্ষর নেই এবং একই কাজে পিডি আবদুল গফুর নিজের নামেও বড় অংকের টাকা প্রত্যার্পণ তুলেছেন। সেই সাথে ট্রেনিং এ যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়েছেন ডিএ। ভ্রমণ কিংবা ট্রেনিং এ যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন অগৃম নেওয়ার বিধান নেই বলে জানা যায়।
ঢাকায় যতবার মিটিং কিংবা গমন করেছেন ব্যাক্তিগত কাজে হলেও নিয়েছেন অগৃম এবং ডিএ। অগৃম নেওয়ার মাধ্যমে ভূয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। একইসাথে কর্মচারীদের নামে অগৃম নেওয়ার বিধান সরকারি চাকুরী নীতিমালায় না থাকলেও কর্মচারীকে দিয়ে জোরপূর্বক অগৃম নিয়ে নিজের পকেট ভারী করেছেন তিনি। মূলত আবদুল গফুর তাঁর অধীনস্থদের ভয় ভীতি প্রদর্শন করে এবং বাধ্যতামূলকভাবেই সবার নামেই অগৃম ও প্রত্যার্পন নিয়ে নিজের পকেট ভারী করতেন।
ফটক নির্মাণে অনিয়ম :
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক ও নেম প্লেটের কাজ প্রীতি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান করলেও মূলত প্রতিষ্ঠানটি আবদুল গফুর নিজের। যার দরুন কাজ শুরু করার পূর্বেই রানিং বিল দিয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ৩৯ লাখ টাকা প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়াই তুলে নেন। অথচ এখনো ৩৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ কাজই হয়নি বলে জানা গেছে।
এছাড়া ৮০ হাজার টাকা দামের টেবিলকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে ৪টি টেবিল ক্রয়সহ কোনো প্রকারের টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে নিজের পকেট ভারী করেন পিডি আবদুল গফুর।
উপাচার্য পরিবর্তনে কোটি টাকা ব্যয়:
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোকসভার পরে কোটি টাকা ব্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তনের জন্য জিসান নামে এক ছাত্রকে বলেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নিউজ করানো, অসাধু শিক্ষার্থীদের টাকা দেওয়ার মত অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছেন তিনি।
প্রকল্প পরিচালক (ভা.) হন যেভাবে:
নন-টেকনিক্যাল লেখাপড়া করে সাধারণ ডিগ্রি পাস করে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মামুনুল ইসলাম, যুগ্ম সচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার সাথে অর্থ ও লেকের মাছ,ফল উপহারের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক হয়ে যান আবদুল গফুর। তাঁর পূর্ণ প্রকল্প পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক করা হয়।
প্রকল্প পরিচালনায় অজ্ঞতার দরুন প্রকল্পের কাজ শুরু করার পূর্বে এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট এ্যাসেসমেন্ট (EIA) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তর হতে পাহাড় কাঁটার অনুমোদন না নিয়ে ভবন তৈরীর কাজ শুরু করে এবং প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পাহাড় কাঁটায় পরিবেশ অধিদপ্তর হতে মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
যুগ্ম সচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার গলা পর্যন্ত গফুরের দেওয়া লেকের মাছ বলেও দম্ভ করেন এই পিডি। একইসাথে মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার পরিবারের পাহাড় ভ্রমণের দায়িত্বও নিতেন আবদুল গফুর।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন:
ঠিকাদারদের মতে, বিশ্বিবিদ্যালয়ের ৪টি ভবন তৈরী করতে শিক্ষা প্রকৌশল তদারকিতে থাকলেও প্রকল্প পরিচালক হওয়ার সুবাদে শিক্ষা প্রকৌশলের মাধ্যমে ঠিকাদারদের সাথে লেনদেন এবং বিল দেওয়ার ক্ষেত্রেও লেনদেন করেছেন তিনি। কনসালট্যান্সি ফার্ম শেলটেক প্রাইভেট লি. এর সাথেও রয়েছে অবৈধ লেনদেন।
সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প কাজে কনসালটেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড শেলটেক কাজ পরিদর্শনে আসেন। যা দেখে মনে হয়েছে প্রকল্প পরিচালক (ভা.)আবদুল গফুরের সোনায় সোহাগা প্রকল্প। একদিনের কাজ পরিদর্শনে আবদুল গফুর ভ্যাট ট্যাক্স বাদেও নিজ নামে বিল করেন ৭৪ হাজার ৫৯৯ টাকা। যেখানে তিনি বোট ভাড়া,গাড়ি ভাড়া,স্টেশনারী,দুপুরের খাবারসহ নানাবিধ ভুয়া খরচ দেখিয়ে নিজের পকেট ভারী করেন।
কনসালটেন্ট নিয়মিত কাজ তদারকি করার কথা থাকলেও প্রকল্প পরিচালকের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে মাসে দুই মাসে একবার আসেন তাঁরা। কনসালটেন্টের আগমন উপলক্ষে প্রতিবারই লক্ষ টাকার খরচ দেখিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা, কর্মচারীর নামে নিয়ে পকেট ভারী করায় ছিলো আবদুল গফুরের সরকারি অর্থ আত্মসাৎের কৌশল।
মাষ্টারপ্ল্যান ফাইলের ৩৮নং পৃষ্ঠায় দেখা যায় একজন কর্মচারী নিশান চাকমার নামে সিপিআরসি মিটিং নামে নেওয়া হয় ২ লাখ ৬৫ হাজার পাঁচ শত টাকা। আব্দুল হকের নামে ২ লক্ষ ৩৯ হাজার পাঁচ শত পঞ্চাশ টাকা। দপ্তরের মনজুরুল ইসলামের নামে অগৃম নেওয়া হয়েছে অনেক বেশি, তাঁর মধ্যে বেশ কিছু ফাইলে তাঁর স্বাক্ষরও নেই।
রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রস্তাব বিস্তার:
নিজের অযোগ্যতা ও দুর্নীতি ডাকতে ৫ই আগস্ট ২০২৪ এর পর আওয়ামী লীগ হতে সার্বিক সুবিধাভোগী পিডি আবদুল গফুর রাতারাতি বনে যান বিএনপি। আওয়ামী এমপি,মন্ত্রী কিংবা নেতাদের সাথে শত শত ছবি তোলা কিংবা আওয়ামী পন্থী উপাচার্যের সব সুবিধাভোগী গফুর এখন বিএনপির কথিত বড় নেতা।
নিজেকে বিএনপি'র বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় দাবি করলেও ছাত্রজীবনে ছাত্রদল কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাঁর বেড়ে উঠা খাগড়াছড়ির মহালছড়িতেও বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিলোনা বলে জানা যায়।
অথচ অর্থ লেনদেনে মাধ্যমে রাবিপ্রবি ছাত্রদলের আহবায়ক ও সদস্য সচিবকে ব্যবহার করে অনৈতিক প্রস্তাব ও প্রভাব বিস্তার করছেন আবদুল গফুর। যদিও এর সাথে ছাত্রদলের সম্পৃক্ততা নেই বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অনিয়ম-দূর্নীতিসহ শৃঙ্খলা বিরোধী নানা কাজের সংশ্লিষ্ট থাকায় চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি সাময়িক বহিষ্কার হন পিডি আবদুল গফুর। এরপর থেকে অর্থ খরচের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তারসহ বিএনপি নেতাদের ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে পিডি আবদুল গফুর।
এ বিষয়ে জানতে রাবিপ্রবির বরখাস্ত হওয়া পিডি আবদুল গফুরের মুঠোফেনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটস্ অ্যাপ অপশনে কথা বলার বিষয়ে মেসেজ লিখে পাঠালেও তিনি কোন সাড়া দেননি।