পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ এক অত্যন্ত জটিল ও মেরুকরণমুখী মোড় নিয়েছে। ঘটেছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদীর উত্থান। তৃণমূলের চ্যালেঞ্জ, বামপন্থীদের অস্তিত্ব সংকট ও কংগ্রেসের অবস্থান ক্রমশ নিচে চলে গেছে।
গত কয়েক বছরে রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীকে কেন্দ্র করে রাজ্যে যে ধরনের ধর্মীয় মেরুকরণ দেখা গেছে, তাকে ভোটব্যাংকে রূপান্তর করাই বিজেপির প্রধান লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য তারা ভালোভাবেই পূরণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।
বিজেপি তৃণমূলকে মুসলিম তোষণকারী দল হিসেবে অভিযুক্ত করে হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজেদের দিকে টানার কৌশল নিয়েছিল পুরো নির্বাচনী প্রচারণাকালে। এ ছাড়া মতুয়া ভোট এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বিজেপির শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছিল, যা ভোটে মমতার জন্য কঠিন পথ তৈরি করে দিয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি বা রেশন দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলো নিয়ে তৃণমূল কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘স্বাস্থ্য সাথী’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো এখনো তাদের প্রধান রক্ষাকবচ।
কিন্তু শেষ অবধি শেষরক্ষা হবে কিনা বলা মুশকিল। বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘বাঙালি অস্মিতা’-এর কার্ড খেলে তৃণমূল তাদের জমি ধরে রাখার চেষ্টা করল এবার। কিন্তু সেটি বোধ করি টিকল না।
বামেদের হারিয়ে যাওয়া বনাম নতুন প্রজন্মের লড়াই
এক সময়ের প্রতাপশালী বামফ্রন্ট এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বামপন্থীদের একটি বিশাল অংশের ভোট সরাসরি বিজেপির দিকে চলে যাওয়ায় তাদের পুনরুত্থান কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বা সৃজন ভট্টাচার্যের মতো তরুণ নেতৃত্বরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে বামপন্থীদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যদিও তা নির্বাচনী পরিসংখ্যানে কতটা প্রতিফলিত হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
কংগ্রেস কোথায়?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কংগ্রেস এখন কার্যত ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো তাদের এক সময়ের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলোও এখন তৃণমূল ও বিজেপির দখলে চলে গেছে। জাতীয় স্তরে তৃণমূলের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থাকলেও রাজ্যে তাদের অবস্থান অনেকটা ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থার মতো। তাদের নির্দিষ্ট কোনো ভোটব্যাংক বা শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো বর্তমানে দৃশ্যমান নয়। ২০২৬-এর নির্বাচন মূলত তৃণমূলের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বনাম বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি’-এর এক চূড়ান্ত মহারণ হচ্ছে। এখানে বাম ও কংগ্রেসের অবস্থান কেবল ভোট কাটাকাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো।
এবারের ভোট ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব
রাজনৈতিক লড়াইয়ের সমান্তরালে পশ্চিমবঙ্গের অপরাধ জগত ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগও নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে অপরাধী চক্রগুলোর তৎপরতা বেড়ে যায়, যা আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তবে তিস্তা পানি বণ্টন বা এনআরসি ইস্যুতে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের রসায়ন বদলে যেতে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে বর্তমান স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় থাকবে, কিন্তু অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান ঝুলে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয় বাংলাদেশের জন্য একটি ‘পরিচিত ও স্থিতিশীল’ প্রশাসনিক পরিবেশ বজায় রাখবে বলে মনে করা হয়। তৃণমূলের শাসনামলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। তবে তিস্তা পানি চুক্তির ক্ষেত্রে মমতার কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি পুরনো চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের নীতির সংঘাত দূর হবে। এটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির জট খুলতে সহায়ক হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছেন। তবে এনআরসি বা সিএএ ইস্যুতে বিজেপির অনমনীয় অবস্থান সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিজেপির কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র থাকলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত উন্নত হতে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূলের জয় বর্তমান সীমান্ত বাণিজ্যের ধারাকে সাবলীল রাখবে।
ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং ঢাকা-নয়াদিল্লি-কলকাতা এই ত্রিভুজ সম্পর্কের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে।