আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামে প্রায় ৭৮ হাজারের মতো কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। এরপরও আশার বাণী শুনালেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর ঘাটতি থাকবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা গবাদিপশুতে পূরণ হবে ঘাটতি।
সোমবার (৪ মে) এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর। তিনি বলেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়তি, মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা, সবকিছু মিলিয়ে গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ কমেছে। মূল সমস্যা হচ্ছে গবাদি পশুর খাদ্যের দাম। যার খরচ যোগান দিতে না পেরে চট্টগ্রাম জেলায় ৩০০ খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে আশার বাণী শুনিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে গবাদি পশুর উৎপাদন কমলেও কোরবানিতে পশু সংকট হবে না। অন্যান্য জেলায় গবাদি পশুর উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে। ওইসব এলাকা থেকে তো চট্টগ্রামে কোরবানির পশু আসবে। তাছাড়া এবার চট্টগ্রামে কোরবানির চাহিদাও কমেছে, ফলে সমস্যা হবে না।
জেলা প্রাণীসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, প্রতিবছর কোরবান উপলক্ষে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত ও কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিস¤পদ দপ্তর। এ বছর তালিকা প্রস্তুত করা হয় গত ২১ এপৃল।
সে তালিকায় দেখা গেছে, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ৭ লক্ষ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। যা গতবছর (২০২৫) ছিল ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ৮৮২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয় উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি।
এর আগে ২০২২ সালে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে গবাদি পশুর উৎপাদন ছিল ৭ লক্ষ ৯১ হাজার ৫০১টি। ওই হিসেবে এ বছরের স্থানীয় উৎপাদন এবারসহ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ৫২ হাজার ৩৫৯টি, ২০২৩ সালে ৮ লক্ষ ৪২ হাজার ১৬৫টি, ২০২১ সালে ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৩৩৪টি, ২০২০ সালে ৬ লক্ষ ৮৯ হাজার ২২টি ও ২০১৯ সালে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছিল ৬ লক্ষ ১০ হাজার ২১৯টি গবাদিপশু।
এর মধ্যে এবার স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত গরুর সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৯টি। যা গতবছর ছিল ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮১৩টি। অর্থাৎ এক বছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর সংখ্যা কমেছে ৩৬ হাজার ৫৩৪টি। এছাড়া এবছর স্থানীয়ভাবে ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল হৃষ্ট করা হয়। যা গতবছর ছিল ২ লক্ষ ৫১ হাজার ৭৪টি।
এছাড়া এ বছর ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, যা গতবছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩টি। পাশাপাশি গতবছর ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হলেও এ বছর সংখ্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩-এ।
জেলা প্রাণিস¤পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ি, এ বছর চট্টগ্রামে কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৭১টি গবাদিপশুর। ওই হিসেবে এবার স্থানীয় উৎপাদনের বিপরীতে ৩৫ হাজার ৫২০টি গবাদিপশুর ঘাটতি রয়েছে।
গতবছর (২০২৫) চট্টগ্রামে কোরবানি পশুর চাহিদা ছিল ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার ৭৭ হাজার ৫৯৮টি কোরবানি পশুর চাহিদা কমেছে। এর আগে ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ৮৫ হাজার ৭৬৫টি ও ২০২৩ সালে ৮ লক্ষ ৭৯ হাজার ৭১৩টি কোরবানি পশুর চাহিদা ছিল চট্টগ্রামে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে কোরবানির পশুর উৎপাদন কমলেও আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবাানির গরুর সংকট হবে না চট্টগ্রামে। তাদের মতে, প্রতিবছরের মতো এবারও রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী ও তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেপারিরা চট্টগ্রামের পশুরহাটে গবাদিপশু নিয়ে আসবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামে গরুর চাহিদা পূরণ হয়ে আরো উদ্ধৃত্ত থাকবে।
খামারিদের অভিযোগ, জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের বাইরের লোক। তাই তারা চট্টগ্রামে কোরবাানির পশুর উৎপাদন বাড়ুক সেটা চাই না। তারা ছলে-বলে কৌশলে চট্টগ্রামের বাইরে থেকে গবাদি পশু এনে ঘাটতি পুরণে ব্যস্ত। কারণ উত্তরবঙ্গের যে কোন জায়গার চেয়ে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর দাম দ্বিগুণ। যা সম্পদ পাচারের শামিল।
খামারিরা বলছেন, চট্টগ্রামে গো-খাদ্য ও বিভিন্ন ওষুধপত্রের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি খামারে নিয়োজিত শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সবমিলিয়ে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এতে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন খামারিরা। ফলে কমেছে স্থানীয় উৎপাদন। যার কোন তদারকি নেই প্রাণিসম্পদ দপ্তরের।
প্রায় একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ স¤পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে গবাদি পশুর উৎপাদন কমার মূল কারণ হচ্ছে, এখানে অস্বাভাবিকভাবে গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন খাদ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। বিষয়টি নিয়ে বহুবছর ধরে আমরা আমাদের এসোসিয়েশন থেকে সরকারকে বলে আসছি। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের যে খাদ্যপণ্য চালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজার মনিটরিং করা হয়, অভিযান চলিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গো-খাদ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু হয় না। ফলে হঠাৎ করেই গো-খাদ্যের উৎপাদকরা দাম দেড়গুণ করে ফেলে। যেমন সয়াবিনের খৈল ২৬০০ টাকা থেকে ৩৩০০ টাকা করে ফেলেছে, এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।
মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, যেসব খামারির আয়ের অন্য কোনো সোর্স নেই, তারা গো-খাদ্যের দাম ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় এডজাস্ট করতে না পেরে খামারই বন্ধ করে দেন। এবার চট্টগ্রামে খামারিও কমেছে। যাদের বিকল্প আয় আছে তারা দাম বাড়লেও অপেক্ষা করেন। চট্টগ্রামে অনেকগুলো ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন এলাকার চৌধুরী এগ্রোর স্বত্ত্বাধিকারী মো রুবেল বলেন, শুধু গো-খাদ্য নয়, অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ওষুধের দামও বেড়েছে। যেমন কৃমির ওষুধ বেড়েছে ৬০-৭০ টাকা। আবার লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে হয়, তখন তেলের খরচ যোগ হয়। খামারের একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা গরুর উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন।
রুবেল বলেন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিরও প্রভাব পড়েছে পশুর খামারে। এক্ষেত্রে তেলের মূল্যে বৃদ্ধির কারণে গো-খাদ্যের পরিবহন খরচ বেড়েছে। প্রতি বস্তা গো-খাদ্য পরিবহন খরচ বেড়েছে ২ টাকা।