কক্সবাজারের ইনানি সৈকতে সাগরের নীল জলরাশির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাসবহুল ‘সি পার্ল বিচ রিসোর্ট’। বাইরের চাকচিক্য আর রমরমা ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-কে রীতিমতো ‘ফাঁদে’ ফেলে ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য ফাঁস হয়েছে এই রিসোর্টটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে।
সি পার্লের এই ‘বন্ড জালিয়াতি’ কেবল একটি কোম্পানির দুর্নীতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠনের এক সুপরিকল্পিত মহোৎসব বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদও। তাঁর প্রশ্ন কক্সবাজারের এই রিসোর্টটিতে বছরজুড়েই পর্যটকদের ভিড় এবং রমরমা ব্যবসা থাকে। তাহলে কেন তারা নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছে না?
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ জানান, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দিয়েও কোনো ফল হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাবে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা আটকে থাকায় এখন চরম অর্থসংকটে ভুগছে খোদ আইসিবি।
আইসিবি সূত্র জানায়, এই বন্ড জালিয়াতির মূল হোতা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ইকরামুল হক টিটু। সি পার্ল রিসোর্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তিনি। ২০১৭ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে আইসিবি-কে ৩২৫ কোটি টাকার বন্ডে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেন।
২০১৭ সালে শুরু হওয়া সেই ৮ বছর মেয়াদী বিনিয়োগই আজ আইসিবির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ১০ শতাংশ সুদে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ষান্মাসিক ভিত্তিতে কিস্তি পরিশোধের কথা থাকলেও সি পার্ল কর্তৃপক্ষ তা থোড়াই কেয়ার করেছে। নিয়মিত কিস্তি না দেওয়ায় ৩২৫ কোটি টাকার মূল বিনিয়োগ সুদে-আসলে এখন ঠেকেছে ৫৯৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৬ টাকায়! অর্থাৎ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এখন এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা আইসিবির।
কেবল কিস্তি ফাঁকি নয়, সি পার্ল কর্তৃপক্ষ বন্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ভঙ্গ করেছে। ২০ শতাংশ শেয়ারে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। ঋণের বিপরীতে সম্পদের ওপর প্রথম চার্জ সৃষ্টি বা বন্ধকীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি, ফলে বিনিয়োগের কোনো নিরাপত্তা নেই। কিস্তি পরিশোধে বিলম্বের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত সুদের শর্তও তারা কৌশলে এড়িয়ে গেছে।
আর সি পার্ল বিচের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ‘বেঙ্গল ফাইন সিরামিক্স লিমিটেড’-এর কারখানা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে কয়েকশ সন্ত্রাসী নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে সেই কারখানা দখল করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেন এত বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থ বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হলো? রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে দেশের আর্থিক খাত পুরোপুরি জিম্মি?
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি ইকরামুল হক টিটুকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের পর গা ঢাকা দিয়েছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং সি পার্ল বিচ রিসোর্টের কর্ণধার ইকরামুল হক টিটু।