প্রায় ৪৮ ঘন্টা পর ‘অজ্ঞাতবাস’ থেকে ফিরলেন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। অন করলেন মোবাইল ফোন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে দেখা দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। জানালেন, ব্যবসায়িক কাজে ছিলেন ব্যস্ত। ‘অজ্ঞাতবাসের’ অন্য কোনো কারণ নেই।
এমনটা জানালেও রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন এম মনজুর আলম বলেন, ‘সব নষ্ট হয়ে গেছে।’ শনিবার (৯ মে) বিকাল ৫টার দিকে মোবাইল ফোনে কল দিলে রিসিভ করেন তিনি। কেমন আছেন জানতে চাইলে গম্ভীর স্বরে বলেন, ‘ভালো’।
অজ্ঞাতবাস কেমন উপভোগ করলেন— জানতে চাইলে স্বভাবসুলভ হেসে ফেলেন, কী লেখেন আপনারা কিছু বুঝতে পারি না। কীসের অজ্ঞাতবাস! আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করি। এগুলো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘উনাদের সঙ্গে তো আমার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। উনারাও করেননি, আমিও করিনি। আমি ভাই আর কোথাও নেই।’
রাজনীতিতে আর সক্রিয় হবেন কি না— জানতে চাইলে মনজুর আলম দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, ‘রাজনীতি করে আর কী করব! সব নষ্ট হয়ে গেছে।’
সূত্র জানায়, জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেওয়ার জোর গুঞ্জনের মধ্যে গত বুধবার সকাল থেকে নিজেকে আড়াল করেন এম মনজুর আলম। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে ছিল এনসিপির যোগদান অনুষ্ঠান। সেদিন পুলিশ ও এনসিপি নেতারা হন্যে হয়ে তার খোঁজ করেন।
শেষ পর্যন্ত মনজুরকে না পেয়ে ‘নামকাওয়াস্তে’ যোগদান অনুষ্ঠান সেরে চট্টগ্রাম ছাড়েন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর শনিবার বেলা ১১টার দিকে নিজের মোস্তফা হাকিম গ্রুপের হেড অফিসে যান এম মনজুর আলম। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলেননি। দুপুর আড়াইটার দিকে বেরিয়ে যান। বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত ছিলেন বাসায়। এরপর আবার বেরিয়ে যান।
ঘনিষ্ঠদের দেওয়া তথ্য, এম মনজুর আলম তাদের পারিবারিক মালিকানায় থাকা মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নগরীর দেওয়ানহাটে গ্রুপের হেড অফিসে বসেন নিয়মিত। অজ্ঞাতবাসের শেষ ২৪ ঘণ্টায় যখন মনজুরকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছিল, তখন তিনি অবস্থান করছিলেন নিজের ‘এইচ এম স্টিল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড’ কারখানায়। যেটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ডাঙ্গারচর গ্রামে।
বুধ ও বৃহস্পতিবার অজ্ঞাতবাসের পুরো তথ্য জানা গেল মনজুরের ঘনিষ্ঠ একজনের কথায়, ‘বুধবার সকাল ৯টার দিকে উনি মোবাইল ফোন বন্ধ করে বাসা থেকে বেরিয়ে সীতাকুণ্ডে যান। সেখানে একটি ওরস মাহফিলে সারাদিন ছিলেন। রাতে আর বাসায় যাননি।
বৃহস্পতিবার সকালে ডাঙ্গারচরের কারখানায় চলে যান। সেখানে সারাদিন ছিলেন। উনার ছেলে ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানতেন না। শুক্রবার সকালে বাসায় আসেন। সারাদিন আর বাসা থেকে বের হননি। শনিবার অফিসে গেছেন।’
ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তির রসিকতা, ‘ডাঙ্গারচরে বসে মনজু সাহেব এনসিপিতে যোগদান অনুষ্ঠান এনজয় করেছেন।’
আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলে ঘুরেফিরে মনজুর এবার এনসিপিতে বাসা বাঁধছেন— এক মাস ধরে এমন আলোচনা চলছিল চট্টগ্রামে। নগর এনসিপির আহ্বায়কের পদ নেওয়ার পাশাপাশি দলটি তাকে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করছে— এমন গুঞ্জনও ছিল।
গত ১৪ এপৃল বিকালে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ মনজুরের উত্তর কাট্টলীর বাসায় গিয়ে বৈঠক করলে এ গুঞ্জন আরও তীব্র হয়। কিন্তু পরিবারের সদস্য, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা এবং ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত মনজুর এনসিপির ঘাটে নৌকা না ভিড়িয়ে ফেরত আসেন।
ছেলে সরওয়ার উল আলমের ভাষ্য, সত্তরোর্ধ্ব বয়স, ব্যাংকঋণ, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ঝামেলা এড়াতে তারাই মনজুরকে আর রাজনীতিতে জড়াতে দিচ্ছেন না। মনজুরও পরিবারের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছেন।