চট্টগ্রামের রাউজানে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে দেখা গেছে ভিডিও ফুটেজে। পুলিশ তাদের সবার পরিচয় শনাক্ত করেছে।
পুলিশের ভাষ্য, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী ‘রায়হান বাহিনীর ক্যাডাররা মাসুদকে খুন করেছে। বড় সাজ্জাদ দুবাইয়ে পলাতক থাকলেও সেখানে বসে হত্যার হুমকি দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর চট্টগ্রাম মহানগর থেকে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় যে ২৬টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে, সবকটি হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত বড় সাজ্জাদের ক্যাডার বাহিনী। কর্ণফুলী নদীর বালুর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসী একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব হত্যাকান্ড হয়েছে তার বাইরে আরও হত্যাকান্ডের ঘটনা অপেক্ষমান রয়েছে। সন্ত্রাসীরা গোপনে নয়, প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগর ও রাউজান-রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আরও কয়েকজনকে হত্যার হুমকি দিয়ে রেখেছে বড় সাজ্জাদ বাহিনী।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫) গুলি করে খুন করা হয়। এর আরও এক মাস আগে তাকে খুন করার হুমকি দেওয়া হয়। যা প্রকাশ্যে গুলি করে হুমকির বাস্তবায়ন করেন সন্ত্রাসীরা।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধ বালু তোলা নিয়ে বিবাধে জড়িয়ে পড়ে রাউজানের আরেক সন্ত্রাসী ফজল হক গ্রুপ ও বড় সাজ্জাদ গ্রুপ। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ গত ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তনের পর ফজল হক গ্রুপের পক্ষে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু তোলার সাথে জড়িয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেতাগি এলাকায় মজুত করা বালুর অর্ধেক ভাগ চাই বড় সাজ্জাদ। কিন্তু বিপরীতে হুঙ্কার ছাড়ায় প্রাণ দিতে হয়েছে মাসুদকে। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্বপনের ভাই। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন স্থানীয় রাজনীতিতে।
হত্যাকান্ডের পর পাহাড়তলি বাজারের সিসি ক্যামেরায় সংরক্ষিত হত্যাকান্ডের দৃশ্য যাচাই-বাছাই করে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, অস্ত্র হাতে পাঁচজনকে দেখা গেছে। এর বেশি থাকতে পারে। তবে যে পাঁচজনকে দেখা গেছে, তাদের সবার পরিচয় আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ সম্ভব নয়। তবে তারা বড় সাজ্জাদ গ্রুপের রায়হান বাহিনীর দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এটা নিশ্চিত। যদিও তাদের মধ্যে রায়হানকে দেখা যায়নি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বড় সাজ্জাদ গ্রুপের রায়হান বাহিনীতে রাউজানের স্থানীয় সন্ত্রাসী ছাড়াও যোগ দিয়েছে ফটিকছড়ি আওয়ামী লীগের দুর্ধর্ষ তৈয়ব বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। যারা মিলেমিশে রাউজান-রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রাম মহানগরকে আতঙ্কের জনপদ বানিয়ে ফেলেছে।
সূত্র জানায়, হত্যার ঘটনাস্থল পাহাড়তলি চৌমুহনী বাজারের আধা কিলোমিটারের মধ্যেই পুলিশের রাঙ্গুনিয়া সার্কেল কার্যালয়। ভিডিও দৃশ্যে দেখা গেছে, হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া পাঁচজনই ছিলেন সশস্ত্র। কালো মুখোশ পরা একজনের হাতে শটগান দেখা গেছে। তিনজনের হাতে পিস্তল এবং আরও একজনের হাতে শটগান ছিল।
ফেসবুকে রবিবার সকাল থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলিবর্ষণের মুখে মাসুদ দৌড়ে একটি দোকানের সামনে এসে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তিন অস্ত্রধারী পেছন থেকে এসে লুটিয়ে পড়া মাসুদকে আবারও গুলি করে। এর ২০ সেকেন্ড পর মুখোশ পরা এক অস্ত্রধারী এসে আবার মাসুদকে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে অস্ত্রধারীরা একটি অটোরিকশায় উঠে দ্রুত চলে যায়।
প্রকাশ্য অস্ত্রধারীদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। তারা হলেন-দিদার, ধামা ইলিয়াছ, আবছার ও ইউছুফ। জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হত্যাকারীদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের একটি ব্যাকআপ টিমও ছিল বলে তাদের সন্দেহ। তারা দূরে অবস্থান করায় ভিডিওতে ধরা পড়েনি।
মাসুদ টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানালেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন, নিহত ব্যক্তি বালু উত্তোলনের ব্যবসা করতেন। রাজনীতিও করতেন। আমরা প্রাথমিক তদন্তে বালু ব্যবসার বিরোধে হত্যাকান্ড বলে জানতে পেরেছি। তবে রাজনৈতিক কোনো বিরোধের তথ্য পাইনি। আরও তদন্ত চলছে। লোকজন খুবই আতঙ্কগ্রস্ত। কেউই মুখ খুলছে না।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মাসুদ রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাদের অভিযোগ, এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় মাসুদকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে খুন করা হয়েছে।
মাসুদকে যে স্টাইলে খুন করা হয়েছে একইভাবে রাউজানে আরও হত্যাকান্ড ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ঈশান ভট্টেরহাট বাজারে খুন হন উপজেলা যুবদল নেতা মুহাম্মদ সেলিম। বোরকা পরা দুই যুবকসহ চার-পাঁচজন অটোরিকশায় এসে সেলিমকে প্রকাশ্যে লোকজনের সামনে গুলি করে খুন করেন। এরপর অটোরিকশায় করে দ্রুত চলে যান।
গত ২৬ এপৃল কদলপুর ইউনিয়নের শমসেরপাড়ায় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন তালুকদারকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাউজানে নাসির হত্যার জেরে গত ৭ মে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় ২৪ বছরের যুবক মোহাম্মদ হাসান রাজুকে গুলি করে একই কায়দায় খুন করা হয়।
একই স্টাইলে প্রত্যেকটি হত্যাকান্ডের সঙ্গে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডারদের স¤পৃক্ততা আছে বলে পুলিশের ভাষ্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই অশান্ত হয়ে ওঠে রাউজান। সর্বশেষ যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদসহ ২৬টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২১টিই রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে এই বালু তোলার কাজ চালিয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক ও রাঙ্গুনিয়া আসনের এমপি ড. হাসান মাহমুদ। হাসান মাহমুদের ছোট ভাই এরশাদ মাহমুদ ও খালেদ মাহমুদ এই বালু তেলা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ সময় এ ধরণের খুনোখুনি বা সংঘর্ষের কোন ঘটনা ঘটেনি।