ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও এলপিজির দাম বেড়েছে এপৃলে। জুনে এসে বাড়ল বিদ্যুতের দাম। আবাসিক থেকে কৃষি, শিল্প, হাসপাতাল, মসজিদ-মন্দির—সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘোষণা দিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যার গড় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
গত ৩ জুন বুধবারের ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হলো ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। বৃদ্ধির গড় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পাইকারি দাম বাড়ল আরও বেশি—৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। বৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একসাথে বিদ্যুতের এত মূল্যবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কার্যকরও হবে ঘোষণার তিন দিন আগে ১ জুন থেকে।
কোন গ্রাহকের বিল কতটা বাড়ছে
মূল্যবৃদ্ধির হার দেখলেই বোঝা যায়, কোনো ধরণের গ্রাহকই রেহাই পাননি। যিনি সারাদিন মাত্র একটি বাল্ব আর একটি পাখা চালান—তিনিও মাস শেষে প্রায় ৪০ টাকা বেশি বিদ্যুৎ বিল দেবেন। যিনি মাসে ৭৫ ইউনিট ব্যবহার করেন— তিনিও বাড়তি দেবেন প্রায় ৬৯ টাকা। যিনি ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি বাড়তি দিবেন প্রায় ২০০ টাকার বেশি।
যিনি ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি দিবেন প্রায় ৪৫০ টাকা বেশি। যিনি ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি দিবেন প্রায় ৬৪০ টাকা বেশি। যিনি ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি বাড়তি দিবেন প্রায় ৯০০ টাকা। আর যিনি ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করেন—প্রতি ইউনিটে তাকে দিতে হবে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা, যা আগের চেয়ে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বেশি। এর সাথে আনুপাতিক হারে বাড়বে ভ্যাট ও ট্যাক্স।
এর মধ্যে যারা দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক গ্রাহক—যারা মাসে মাত্র শূন্য থেকে পঞ্চাশ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, দরিদ্রতম এসব গ্রাহকদের বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। যা ইউনিটপ্রতি দাম হয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা। সে হিসেবে পঞ্চাশ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৭ টাকা।
অথচ এসব গ্রাহকদের বলা হয় ‘লাইফ লাইন’ গ্রাহক। সারাদেশে এই শ্রেণিতে আছেন এক কোটি আটাত্তর লাখের বেশি গ্রাহক। তাদের মধ্যে এক কোটি একষট্টি লাখই পল্লী বিদ্যুতের গ্রামীণ গ্রাহক।
এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, ধর্মীয় স্থান—সবখানে নেমে এসেছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আঘাত। কৃষি সেচে বিদ্যুতের দাম বাড়নো হয়েছে ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪ পয়সায়, যার হার ১৫ শতাংশ। সেচের এই খরচ বাড়লে চাষের খরচ বাড়বে। চাষের খরচ বাড়লে বাড়বে চালের দাম। স্কুল, মসজিদ, মন্দির, হাসপাতালে বিদ্যুতের দামও বাড়ল প্রায় ২০ শতাংশ। যে হাসপাতাল দরিদ্র রোগীদের সেবা দেয়, তার বিদ্যুৎ বিল বাড়লে সেবার মান বা খরচে প্রভাব পড়বে।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দাম বাড়ল ১৮ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ। নির্মাণ খাতে ইউনিটপ্রতি দাম ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে লাফ দিয়ে হলো ১৯ টাকা ৯ পয়সা। বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনেও দাম বাড়ল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ।
ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে গ্রাহকরা
বিদ্যুতের দাম কেন বারবার বাড়ছে—এর মূল উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক বিষফোঁড়ায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে ‘অলস’ বসিয়ে রেখে ভাড়া দিতে হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পৌঁছে গেছে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। আগামী বছর হতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।
সূত্রমতে, ২০১১ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা। এখন সেটি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা। কারণ কী জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তব চাহিদার চেয়ে বহু বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখন ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
১১ হাজার মেগাওয়াটের উদ্বৃত্ত সক্ষমতা অলস বসে আছে। সেই অলস কেন্দ্রগুলোর ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা। যা পুরোটাই ভুতুড়ে ও লুটপাটের আঁখড়া। আর এই টাকা আসছে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় ফের বাড়লো বিদ্যুতের দাম।
দাম বাড়ানোর পর সরকারের বিদ্যুৎ ভর্তুকি ৫৬ হাজার কোটি থেকে কমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটি টাকায়। সরকার বাড়তি রাজস্ব পাবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা প্রতি বছর বাড়ছে। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ না করলে এই ব্যয় কমবে না। আর যতদিন এই বোঝা থাকবে, ততদিন জনগণের কাঁধেই চাপানো হবে মাশুল।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকটের শিকড় গভীরে। অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত, অপরিকল্পিত কেন্দ্র নির্মাণ, ক্যাপাসিটি চার্জের অসুস্থ ব্যবস্থা—এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধু দাম বাড়িয়ে সমাধান আসবে না। কিন্তু সেই কঠিন সংস্কারের পথে না হেঁটে মানুষের ঘাড়ে পা ফেলে হাঁটা হলো।
প্রতিশ্রুতিও রাখলো না বিএনপি সরকার
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঘোষণা দিয়েছিলেন—আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। দায়িত্ব নেওয়ার একশো দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির দামও বেড়েছে কয়েক দফা। আর অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাকে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকারের কোনো চাপ ছিল না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। তারপরও সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, সব শ্রেণির মধ্যে লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কম হারে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর রেট অব রিটার্ন ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।