কাজী সাঈদা বেগম নিপার দূর্নীতিতে কাঁপছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখা। যেখানে তিনি কর্মরত আছেন হিসাব কর্মকর্তা (সংগ্রহ) হিসেবে। সঠিক তদারকি না থাকায় যেখানে একচ্ছত্র দূর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।
শাখায় সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, ২% থেকে ৩% কমিশন ছাড়া বিলের ফাইল ছাড়েন না কাজী সাঈদা বেগম নিপা। এভাবে প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। এমনকি ভুয়া বিলের বিপরীতে কোটি কোটি টাকা বিল তুলে আত্নসাতের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছেন।
আর তার দূর্নীতির অর্থের ভাগ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও ঢাকা রেল ভবনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও চলে যায়। এমন কথা বলেই কমিশন হাতিয়ে নেন তিনি। যদিও এসব অর্থের ৮০ ভাগ মেরে দেন কাজী সাঈদা বেগম নিপা।
ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানান, হিসাব কর্মকর্তার নাম কাজী সাঈদা বেগম হলেও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সকলে তাকে চিনেন নিপা নামেই। আবার ফেসবুকে নিজের আইডি খোলা হয়েছে নিপা সাঈদা নামে। যাতে কেউ তাকে সঠিকভাবে চিনতে না পারেন।
সূত্র জানায়, বরিশালের মেয়ে কাজী সাঈদা বেগম নিপা গত ১০-১২ বছর ধরে রেলওয়েতে কর্মরত রয়েছেন। স্বামীও দূর্নীতিগ্রস্ত জনতা ব্যাংকের প্রিন্সিপ্যাল অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মরত আছেন। এই সুবাধে তিনি বেশিরভাগ সময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ও পাহাড়তলিতে চাকরি করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ি তাকে বদলি করা হলেও ঘুষবাজিতে খুব অল্প সময়ে তিনি ফিরে আসেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবিতে।
এ সুযোগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখায় কর্মরত থেকে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির টাকায় তিনি ফুলে ফেঁপে উঠেন। তার চেহারার গ্ল্যামার দেখলে বুঝা যায় অবৈধ টাকায় কী পরিমাণ ভিটামিন আছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জনৈক ঠিকাদার জানান, গত এক বছর আগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজের টেন্ডার পাই আমি। কাজ শেষে বিলের ফাইল সাবমিট করা হলে দিনের পর দিন ঘুরা শুরু হয় এই প্রকিউরমেন্ট শাখায়। এর কারণ শাখার হিসাব কর্মকর্তা কাজী সাঈদা বেগম নিপা আমার কাছ থেকে ৩% কমিশন দাবি করে। আমি ১% দিতে রাজী হলেও তিনি আমার বিলের ফাইল আটকিয়ে রাখেন।
একই কথা বলেন আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী ঠিকাদার। তারা জানান, ঠিকাদারদের কাছ থেকেও ৩% কমিশন নিয়েই ফাইল ছাড়েন নিপা। কমিশন ছাড়া কোনরকম ফাইল ছাড়েন না তিনি। এছাড়া ভুয়া বিলের কাগজ তৈরী করেও প্রায়ই সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। যা দুদক কর্তৃক তদন্ত করা হলে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
ঠিকাদারদের এ দাবির মিল পাওয়া গেছে ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখা কর্মচারীদের মুখেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, কাজী সাঈদা বেগম নিপা অফিসের সব। তিনি যাই বলেন তাই সঠিক। নানা অনিয়ম দূর্নীতি করেও তিনি স্বাচ্ছন্দে রয়েছেন সঠিক তদারকি না থাকার কারণে।
তিনি বলেন, শাখায় একজন ডিএফএ অতিরিক্ত হিসেবে একাউন্টস বিভাগের কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন দায়িত্বে থাকলেও তিনি এ শাখার খোঁজ তেমন রাখেন না। কারণ দিন শেষে নিপা ম্যাডাম একাউন্টস বিভাগে গিয়ে দেখা করেন। দিয়ে আসেন ভাগও। এছাড়া একাউন্টস চিফের ভাগও পৌছায় দেন তিনি। ফলে এতো অনিয়মের পরও নিপা ম্যাডামের কিছুই হয় না।
ক্ষুব্দ কর্মচারীরা জানান, ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখায় প্রতি অর্থবছরে অন্তত ১৫০ কোটি টাকার বিলের বরাদ্দ মিলে সরকার থেকে। সেই টাকার ৩% হিসেবে সাড়ে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন নিপা ম্যাডাম। অথচ সারাদিন কষ্ঠ করেও আমরা কোন সুবিধা বা ভাগের এক টাকাও পায় না।
এ বিষয়ে জানতে সম্প্রতি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখায় গেলে কাজের ব্যস্ততা দেখান কাজী সাঈদা বেগম নিপা। একপর্যায়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কোন বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রয়েছে, ওনারাই বলবেন।
অনিয়ম যদি আপনি করেন তাহলে সে বিষয়ে আপনি বলতে পারবেন না, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন কেন? আপনার দূর্নীতির দায়িত্ব কি উর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়ে ফেলেছেন? নাকি রাষ্ট্র আপনাকে অনিয়ম করার জন্য বলেছেন, কোনটা?
এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী সাঈদা বেগম নিপা বলেন, নিয়ম মোতাবেক আপনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। সাংবাদিক আমার পরিবারেও আছে। আমরা কিছুই জানি না যে তা না। এভাবে হুমকি দিয়ে তিনি কোন কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএফএ/স্টোর্স এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (বুকস এন্ড একাউন্টস) চিফ শামীমা ইয়াসমিস বলেন, কই কোন ঠিকাদার তো আমাদের কাছে এসব নিয়ে কোন অভিযোগ করেননি। আপনার কাছ শুনলাম প্রথম।
ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা বলছেন, আপনি ভাগের অংশ পেয়ে যান। তাহলে তারা কার কাছে অভিযোগ করবে? এ কারণেই তো সাংবাদিকেদের কাছে অনিয়মের তথ্যগুলো শেয়ার করেছেন। এ কথা বলায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমিও ভাগ পায়, এ কথা বলেছেন। ঠিক আছে ঠিকাদাররা অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) মো. সাইদুর রহমান সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি হুয়াটস অ্যাপ ইনবাইটেড পাওয়ায় কোন মেসেজ লিখে পাঠানোও সম্ভব হয়নি।
পরে রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে সিআরবির হিসাব দপ্তরে সাক্ষাৎ করতে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। দপ্তরের একজন কর্মচারি জানান, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) মো. সাইদুর রহমান সরকার এদিন সকাল থেকে মহেশখালীতে রয়েছেন।
(বি: দ্র:-রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগের নানা অনিয়ম নিয়ে আসছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানের অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে। সেই সাথে তথ্য দিয়েও সহযোগীতা করতে পারেন।}