ভারতের রাজধানী এখন অনেকটাই 'ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে। গত সোমবার থেকে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার আর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে শুনা যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পতনের ধ্বনি।
এমনটাই জানিয়েছেন ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রি। তিনি বলেন, তোপের মুখে গুটিয়ে আসছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। বুধবার রাতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানীর ১৬টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বন্ধ থাকা মেট্রো স্টেশনগুলোর মধ্যে লোক কল্যাণ মার্গ, রাজীব চক, সুপ্রিম কোর্ট, সেবা তীর্থ ও সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনও রয়েছে। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দীপ। তিনি বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। তবে শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের প্রতি অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি।
অভিজিৎ বলেন, আন্দোলনের ৩৪তম দিন চলছে এবং সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ২৬তম দিন। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে তিনি বলেন, ওয়াংচুকের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ুক, তা তারা চান না।
সিজেপি প্রধান অভিযোগ করেন, বিজেপি বাইরে থেকে লোক এনে তাদের আন্দোলন ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে। তার দাবি, আন্দোলনকারীদের বদনাম করতে বহিরাগতদের দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করানো হচ্ছে এবং পরে সেই দায় সিজেপির ওপর চাপানো হচ্ছে। এমনকি পুলিশও এ কাজে সহযোগিতা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বিজেপি বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বুধবার সন্ধ্যার পর যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ইন্ডিয়া গেট এলাকাতেও বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এ সময় কয়েক দফা পাথর নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
পুলিশের দাবি, কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিরাপত্তাকর্মীদের লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংসদ ভবন অভিযান
গত সোমবার সিজেপি সরাসরি সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দিলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সংঘাত চরমে পৌঁছালে সিজেপি দাবি করে, সরকার তাদের আলোচনার জন্য ডেকেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরাই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
জেপি নাড্ডা ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক হয়। তারা লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।’ তবে মূল বিষয় হলো, বৈঠক এবং স্মারকলিপি প্রদান হলেও মোদি সরকার সিজেপির মূল দাবি মেনে নেয়নি। আর সিজেপিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
মঙ্গলবারও সিজেপির বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এদিন বিক্ষোভে যোগ দেয় ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হলে বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। পরে অবশ্য তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভারতজুড়ে কেন এই আন্দোলন
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদেন শুরু হয় এই আন্দোলন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এই আন্দোলন শুরু করে গত কয়েক সপ্তাহে আগে। আর গত সোমবার সংসদ অভিযানের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন ছাত্র-যুবদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী জোটের নেতারা। পরে তাদের আটক করে পুলিশ।
মুক্তির পর বুধবার সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। তার দাবিগুলো হলো— নিট কেলেঙ্কারির দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা প্রার্থনা।
আর এ থেকে এখন নড়েবড়ে মেদির মসনদ। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা বলেছেন, সরকার সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত। তবে এ ইস্যুতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আন্দোলন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
নতুন রাজনৈতিক তরঙ্গ?
এই আন্দোলনের মূল শক্তি কোথায়—তা নিয়ে বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব যন্তর মন্তরে বলেন, ‘আজ যে নতুন প্রজন্মকে দেখছি, তারা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছে না। তারা লড়ছে একটি স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি এবং এমন এক রাজনীতির জন্য, যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।’
সাংবাদিক স্মিতা শর্মার মতে, এই আন্দোলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো এটি সম্পূর্ণ ‘নেতৃত্বহীন আন্দোলন’। মেট্রো বন্ধ ছিল, ইন্টারনেট ছিল না, সিজেপি নেতারা কোনো বার্তা পাঠাতে পারছিলেন না; তবুও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ দায়িত্বে রাস্তায় নেমে এসেছে। পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করেও তারা পিছু হটেনি।
মোদি সরকারের লাল সংকেত
প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রি এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মোদি সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকার ভেবেছিল জনগণকে রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যস্ত রাখা যাবে, কিন্তু এই আন্দোলন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। হেমন্ত অত্রি আরও বলেন, ‘সরকার হয়তো ভেবেছিল তারা সব সময় ধর্মীয় রাজনীতি চালিয়ে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু এই তরুণরা প্রমাণ করে দিয়েছে—জনগণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা, চাকরি আর রুটি-রুজির মতো বাস্তব ইস্যুতে ফিরে আসবেই।’
দিল্লির রাস্তায় আজ যে যুবশক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা আগামী দিনে ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে। যুবসমাজ যখন পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়, তখন বুঝতে হবে ক্ষোভের মাত্রা অনেক গভীরে। সরকার এই তরুণদের দাবি উপেক্ষা করলে এই ‘ককরোচ আন্দোলন’ সামনে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
ককরোচ জনতা পার্টি কি?
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মূলত কোনো চিরাচরিত রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি নাগরিক সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের অনুসারী সংখ্যা মাত্র দুই দিনে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছিল—অনলাইন দুনিয়ায় জন্ম নেওয়া এই আন্দোলন বাস্তবে রাজপথে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে?
সোমবারের ঘটনাই সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। ইন্টারনেটে সেন্সরশিপ আর যাতায়াত ব্যবস্থা স্তব্ধ করার পরও হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমে প্রমাণ করেছে, তাদের আর চেপে রাখা সম্ভব নয়। ভারতের স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মা বলেন, ‘এই লড়াই এখন আর শুধু শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, রেকর্ড বেকারত্ব আর ভোট কারচুপির মতো গুরুতর প্রশ্ন।’