নিরাপত্তা জোরদার করতে জঙ্গল সলিমপুরে বসানো হচ্ছে সর্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা। ড্রোন দিয়ে মনিটর করা হবে সবসময়। সেই সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরের আশপাশের পুরো এলাকা জুড়ে বসছে বাড়তি চেক পোস্ট। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। সবমিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে নিরাপত্তার কঠিন ঘেরাটোপে রাখার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এই ঘটনা সরকারকে নাড়িয়ে যায়। এর আগেও সেখানে সাংবাদিক থেকে শুরু করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। ফলে সন্ত্রাসীদের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে জঙ্গল সলিমপুর।
সূত্র বলছে, র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার পর চলতি বছরের ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে সেনা বাহিনী, পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য অভিযান চালায়। অভিযানে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। গ্রেফতার হয় ১৫ জন। উদ্ধার হয় অস্ত্র-গোলাবারুদ।
এমন ঘটনার পর গত ২৪ মে দিবাগত রাতে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগরে র্যাবও পুলিশের যৌথ বাহিনীর ক্যা¤েপ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়। হামলায় অংশ নেয় প্রায় ৩০০ সন্ত্রাসী। হামলাকারীরা বুলডজার দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মাণাধীন ভবন গুড়িয়ে দেয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে রাস্তা কেটে দেয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে ক্যা¤প ছাড়তে বাধ্য করে। পরে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গোলাগুলি হয়।
জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান পরিস্থিতি স¤পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বলেন, বিষয়টি সরকারের তরফ থেকে অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে কড়া নির্দেশনা এসেছে। সরকার এটিকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সন্ত্রাসীদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।
এ জন্য জঙ্গলসলিমপুর সলিমপুরকে নিরাপদ করতে যা যা করণীয়, তার সবই করা হচ্ছে। চলছে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি। সেই সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশসহ আশপাশের এলাকায় নিয়মিত বাড়তি চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। চেকপোস্টে ২৪ ঘণ্টা তল্লাশি কার্যক্রম চলছে।
সেখানে কে বা কারা যাতায়াত করছে, নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের স¤পর্কেও বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি করে ফেলা হবে পুরো জঙ্গল সলিমপুর। আশপাশের এলাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব সিসি ক্যামেরায় নাইট ভিশন মোড রয়েছে। যাতে করে রাতের অন্ধাকারেও কেউ যাতায়াত করলে সিসি ক্যামেরা তাদের ছবিও গতিবিধি ভিডিও করে রাখতে পারে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এক জন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে বহু মানুষের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। মিছিল মিটিংয়ে লোকের জোগান, অবৈধ মাদক চোরাচালান, অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যবসা, সরকারি জমি বেদখল করে লিজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, ঘর ভাড়া দিয়ে কাচা টাকা রোজগার থেকে এমন কোনো বেআইনি কাজ নেই, যা জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে হয় না।
সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবেও ব্যবহৃত হয় জঙ্গল সলিমপুর। এ ছাড়া সেখানকার কিশোর, তরুণ ও তরুণীদের নিয়ে গড়ে তোলা সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। এ ছাড়া আছে মানবপাচারের ব্যবসা। জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। যারা সেখানকার টার্গেটকৃত বাসিন্দাদের উন্নত জীবনের প্রলোভনে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে অবৈধভাবে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়। সেখানে দেশি-বিদেশি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টিও প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, জঙ্গল সলিমপুরকে অনেক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। যদিও সেটি সম্ভব হয়নি। তাই দলবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো জঙ্গল সলিমপুরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কানেকশন রয়েছে জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের পেছনে দেশি-বিদেশি সন্ত্রাসী, জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মদত থাকার বিষয়টি দিবালোকের মতো ¯পষ্ট। পুরো ঘটনাটি একটি মেকিং গেম। এমন গেমের কারণ জানতে আরো সময় লাগবে।
তবে প্রাথমিক তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, পুরো পাহাড়কে অশান্ত করার নীল নকশার অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এখন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো বড় বিপদ আসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এক সময় তিন হাজার ১০০ একর জায়গায় হাজার হাজার সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য ছিল। প্রায় ৩০ বছর জঙ্গল সলিমপুর ছিল সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে। পুরো বিষয়টির সঙ্গে বিদেশি যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বিদেশিদের বাংলাদেশে থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এসব ভারী আগ্নেয়াস্ত্র বিভিন্ন সীমান্ত পথে বা সমুদ্র পথে জাহাজে করে চট্টগ্রামে আনার পর সেগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে পৌছে যায়। জঙ্গল সলিমপুরসহ সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভারি অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলছে সন্ত্রাসীরা। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের কারো কারো নাম আসছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, জঙ্গল সলিমপুরকে পুরোপুরি নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যদিও সেখানকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। জঙ্গল সলিমপুরে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ, র্যাব, সেনা বাহিনী, বিজিবি সদস্যদের সুযোগ সুবিধা আরো বাড়ানো হবে। তাদের হাতে দেয়া হচ্ছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তি। যাতে করে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তারা সক্ষম হয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।