চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো নরম মাটিতে গড়া। আর সেই পাহাড়ে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছেন মৃত্যু ঝুঁিক নিয়ে। সেটা জানেন বসতিরাও। কারণ তাদের চোখের সামনেই বছর-বছর পাহাড় ধসে প্রাণহানি হয়েছে শত শত আপনজনের। তারপরও কমছে না বসতি, বাড়ছে আরও বছরে-বছরে।
রবিবার (৩ মে) আলাপকালে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকজন। তাদের মতে, পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপন প্রতিরোধ করার কথা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাাসন ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের। কিন্তু এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই তাদের। এ নিয়ে কথা বললে উল্টো মুচকি হাসেন তারা।
তবে মুখে বলেন, করছি তো, কেউ তো শুনতেছে না। পাহাড়ে বাড়ি বানানোর সময় কেউ তো আর আমাদের বলে করে না। আবার উচ্ছেদের পর ফিরেও আসে তারা। এছাড়া বর্ষা আসলে তাদের সরে যেতে মাইকিংও করা হয়। অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
এসব কথার বিপরীতে যখন বলা হয়, এটা তো শাসন বা নিয়ন্ত্রণ নয়, সেবা করছেন আরও। এতো জামাই আদর পাওয়ায়ই তো পাহাড় আর পাহাড় থাকছে না। এমন মন্তব্যে মুখ ভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়ে যারা বসতি গেড়েছেন তাদের একজনও চট্টগ্রামের লোক না। কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশালসহ উত্তরবঙ্গ থেকে আসা লোকজন ওরা। আর চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলসহ সকল সরকারি সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তারাও চট্টগ্রামের বাইরের লোক।
ব্যস, শুধু পাহাড়ে বসতি কেন, চট্টগ্রামে কোন রকম অন্যায়-অপরাধে সঠিক কোন ব্যবস্থা নেই এসব বহিরাগতদের বিরুদ্ধে। সবাই মিলে ইসরাইলের মতো চট্টগ্রামকেও ফিলিস্তিন বানাতে ব্যস্ত। সরকারি দায়িত্বে চট্টগ্রামের লোক থাকলে হয়তো এমন পরিস্থিতি হতো না।
৬৬৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার :
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর মোট ঝুঁকিপূর্ণ বসতিস¤পন্ন পাহাড় ২৬টি। এসব পাহাড়ে গত বছর অবৈধ বসতির সংখ্যা ৬ হাজার ৫৫৮। এ বছর নতুন করে আর জরিপ হয়নি। তবে বসতি আরও বেড়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনও। অথচ ২০১৪ সালে নগরীর ১১টি পাহাড়ে বসবাস করত ৬৬৬টি পরিবার।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার ফয়স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে। সেখানে থাকেন প্রায় ৪ হাজার ৬৪৭ পরিবার। এছাড়া নগরীর মতিঝর্ণা ও বাটালীহিল পাহাড়ে বসবাস ৪৩১ পরিবারের।
এছাড়া কৈবল্যাধাম হাউজিং এস্টেট সংলগ্ন পাহাড়ে ১৪৬ পরিবার, পলিটেকনিক হল্ট স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশ ১২ পরিবার, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে পাঁচ পরিবার, ষোলশহর স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৭৪ পরিবার, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৬ পরিবার, লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন বিজয় নগর পাহাড়ে ২৮৮ পরিবার, আমিন জুট মিলস কলোনি সংলগ্ন ট্যাঙ্কির পাহাড়ে ৬৫ পরিবার, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার ১৫০ দাগের খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ে (জয়ন্তিকা আবাসিক সংলগ্ন) ২৮ পরিবার, বিএস ২১২ ও ২১৩ দাগের পাহাড়ে (মুরগি ফার্ম হয়ে গার্ডেন ভিউ সোসাইটি সংলগ্ন) ১২ পরিবার, আকবর শাহ বেলতলী পাহাড়ে ৮৯ পরিবার, পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩ পরিবার বসবাস করছে।
এছাড়া লালখানবাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩২৩ পরিবার, হারুন খান সাহেবের পাহাড়ে ১৪৪ পরিবার, নাছিয়াঘোনা এলাকায় ১২ পরিবার, চিড়িয়াখানার পেছনের পাহাড়ে ২৮ পরিবার, মধুশাহ পাহাড়ে ২৯ পরিবার, জালালাবাদ সংলগ্ন পাহাড়ে পাঁচ পরিবার, নাগিন পাহাড়ে ২৫ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন মীর মোহাম্মদ হাসানের পাহাড়ে ৩৮ পরিবার, এমআর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৪২ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৪৯ পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে (রৌফাবাদ, অক্সিজেন) ১১ পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
রেলের সাত পাহাড়ে ৫ হাজার ৩৩২ পরিবার:
জেলা প্রশাসনের হিসাবের বাইরে চট্টগ্রামে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে পাঁচ হাজার ৩৩২ পরিবার রয়েছে। সেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এসব পাহাড়ে বসবাস করে আসছেন অনেক মানুষ। দিন দিন এই অবৈধ বসতির সংখ্যা বাড়ছে।
রেলওয়ে ভু-সম্পত্তি বিভাগের তথ্যমতে, রেলওয়ের মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবৈধ পরিবারের বসবাস নগরীর ফয়স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নং ঝিল পাহাড়ে। এখানে ৫ হাজার ৩৩২টি পরিবার থাকে। এছাড়া মতি ঝরনা ও বাটালি হিল এলাকায় বসবাস ৪৩১টি পরিবারের।
লেক সিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন বিজয় নগর পাহাড়ে বসবাস ২৮৮টি পরিবারের। রেলওয়ের মালিকানাধীন ষোলশহর স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৭৪টি, নগরীর জাকির হোসেন সড়কে পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৬টি পরিবার বসবাস করছে।
পাহাড় ধসে প্রাণহানির ইতিহাস:
চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে প্রতিবছরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। ওই বছর ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ওই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকা, লেডিস ক্লাব, শহরের কুসুমবাগ, কাছিয়াঘোনা, ওয়ার্কশপঘোনা, মতিঝরনা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ প্রায় সাতটি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই দিন ভোরে অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব পাহাড় ধসে নারী-শিশুসহ ১২৭ জনের মৃত্যু হয়।
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখানবাজার মতিঝরনা এলাকায় পাহাড় ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিল পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে মতিঝরনায় দেয়াল ধসে দুই জন মারা যান। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান তিন জন, একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় মারা যান মা-মেয়ে।
২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড়ধসে মারা যান চার জন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা পাহাড়ধসে এক শিশু প্রাণ হারায়।
২০২২ সালে ১৭ জুন পাহাড়ধসে নিহত হয় আরও চার জন। ওই দিন রাত ২টায় এবং ১৮ জুন ভোর ৪টায় নগরীর আকবর শাহ থানাধীন ১ নম্বর ঝিল ও ফয়স লেক সিটি আবাসিক এলাকায় এ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও পাঁচ জন আহত হন। এত হতাহতের পরও বন্ধ হচ্ছে না চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন ও বসবাস। উল্টো পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে।
তিন জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতির তালিকাই নেই:
২০১৭ সালে পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাঙামাটি। তখন এই জেলায় পাহাড়ধসে মারা যায় ১২০ জন। কিন্তু এ ঘটনার পর তদন্ত কমিটির যে সুপারিশ ছিল, তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এমনকি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দা নিয়ে কোনো জরিপও নেই।
তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রূপনগর, নতুনপাড়া, শিমুলতলী, পশ্চিম মুসলিমপাড়া ও ভেদভেদী। তিন বছর আগে এই পাঁচ এলাকার ৩১ স্থানকে অতিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন সাইনবোর্ড দেয় জেলা প্রশাসন। তবে বিভিন্ন দপ্তরের হিসাবে এসব এলাকায় ২০১৭ সালের চেয়ে অন্তত ৫০০ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বেড়েছে।
বান্দরবানে ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত বছর জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় পাহাড়ধসে একজন মারা যায়। কিন্তু জেলাটিতে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দার কোনো তথ্য বা জরিপকাজ হয়নি। ২০১৭ সালে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছিল ১ হাজার ৪৪৪টি পরিবার। এর মধ্যে পৌরসভাসহ লামা উপজেলায় ৪৫০ পরিবার, নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩২৩, পৌরসভাসহ বান্দরবান সদর উপজেলায় ২৩২ পরিবার, রোয়াংছড়িতে ৫৯, আলীকদমে ২১৩, রুমায় ৮৩ ও থানচিতে ১০৮টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করে। কিন্তু এই সাত বছরে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
খাগড়াছড়ি জেলাও পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দার সংখ্যা নিয়ে কোনো জরিপ নেই। জেলা প্রশাসনের ধারণা অনুযায়ী ৯টি উপজেলায় এক হাজারের বেশি বসতি রয়েছে। ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিলে তাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সহস্রাধিক বসতি পাহাড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্যোগের সময়ে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি-২, ছবি-দৈনিক ঈশান
বছর বছর বাড়ছে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি:
চট্টগ্রাম মহানগর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্র জানায়, নগরীর মোট ঝুঁকিপূর্ণ বসতিস¤পন্ন পাহাড়ে গত বছর অবৈধ বসতির সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৫৮। এ বছর নতুন করে আর জরিপ হয়নি। তবে বসতি আরও বেড়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনও।
কমিটির তথ্যমতে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে ১০ গুণ। আর তিন পার্বত্য জেলায়ও পাহাড়ে বসতি গত সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা একরকম নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এসব বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে বিগত বছরের হিসাবের তথ্যের গড় হিসেব করলে বুঝা যায় কী পরিমাণে বসতি বাড়ছে পাহাড়ে।
পাহাড়ে বসতি বাড়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগরে যেখানে এক খন্ড জমির মূল্য কোটি টাকা, সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা এসব হতদরিদ্র পরিবার বিনামুল্যে পাহাড়ে মাথা গোজার ঠাঁই করে নিচ্ছে। গড়ছে বসতি। এতে তাদের প্রাণহানিরও ভয় নেই।
পুরো বছর নিরব বর্ষা আসলেই তোড়জোড়:
বছরের পর বছর পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বাড়লেও পুরো বছর নিরব থাকেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। বর্ষা আসলেই নামেন সেবার ঢালা নিয়ে। তখন পাহাড় থেকে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। যা পুরোপুরি মানবিক কাজ।
এ সময় জামাই আদরে সরকারি গাড়িতে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়, বিনামুল্যে দেওয়া হয় খাবার, করা হয় সরকারি কোন ভবনে রাতযাপনের ব্যবস্থা। যা সারা বছরের চেয়ে কয়েকদিন হলেও ভাল সময় কাটান অবৈধ বসতিরা। আর এর মাধ্যমেই তারা পাহাড়ে নিশ্চিন্তে বসবাসের সুযোগ পান। এ সুবাধে আত্নীয়-স্বজনদেরও ডেকে নিয়ে আসেন তারা। করে দেন পাহাড়ে বসতির সুযোগ।
এবারও ঠিক একই কাজে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের সতর্কবার্তা পেয়ে শুরু করেছে মাইকিং। অনুরোধ করা হচ্ছে পাহাড় থেকে সরে গিয়ে সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামসহ দেশের ৪ বিভাগে সোমবার (৪ মে) দুপুরের মধ্যে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে। একইসঙ্গে সংস্থাটি আশঙ্কা করছে- অতি ভারি বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস হতে পারে।
গুমড়ে মরছে ৩৬ দফা সুপারিশ:
পাহাড়ধসের বিভিন্ন ঘটনার পর গঠিত বিভিন্ন তদন্ত কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবের মধ্যে পাহাড় কাটায় জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংস্থার দুর্বৃত্তায়ন কঠোর হাতে আইনানুগভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ন্যাড়া পাহাড় বনায়ন, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, পাহাড়ি এলাকায় শহর সম্প্রসারণ নিরুৎসাহিত করাও ছিল।
সুপারিশের ভিত্তিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সাতটি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। যার মধ্যে ছিল, পাহাড়ে অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা; পাহাড় কাটা বন্ধ করা; যাদের উচ্ছেদ করা হবে তাদের আশ্রয়ণে পুনর্বাসন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা; পাহাড় কাটা বা পাহাড়ে বসবাসের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও ৩৬ দফা সুপারিশমালা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা।
পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি সবুজায়নের কথাও ছিল। কিন্তু উদ্যোগের অভাবে গুমড়ে মরছে এসব সুপারিশ। ফলে সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর বাড়ছে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। এখন ভারী বর্ষণ হলে সাময়িকভাবে মাইকিং, বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে প্রশাসন ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি।
গত মঙ্গলবার থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছে চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলায়। এতে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় অবৈধ বসবাসকারীদের প্রাণহানি ঠেকাতে ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে সরে যেতে মাইকিং করছে প্রশাসন। কিন্তু একজন বাসিন্দাও সরেননি। প্রশাসনের সতর্কবার্তা কানেই তুলছেন বাসিন্দারা।
যা বললেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা:
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদের বিষয়ে সারা বছরই অভিযান চালানো হয়। এরপরও পাহাড় কাটা থেকে জড়িতদের সরানো যায়নি।
তিনি বলেন, পাহাড়ে বসতি গড়ে তোলা এতগুলো লোকের স্থায়ী পুনর্বাসন কঠিন। তারপরও সরকারি বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে কিছু কিছু পুনর্বাসন করা হয়েছে। বৃষ্টি হলে আমরা পাহাড় থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিচ্ছি। লোকজনের মধ্যে ভয়টাও কাজ করে না।
এছাড়া প্রতি বছর বর্ষা শুরুর আগে রেলওয়ে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারপরও তারা আবার এই অবৈধ স্থাপনায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য চলে আসে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ জিসান দত্ত বলেন, রেলওয়ের পাহাড়গুলোতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা বসবাস করছেন তাদেরকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য শনিবার সকাল থেকে মাইকিং করা হয়েছে। পাহাড়তলী, ফয়স লেক, আকবরশাহ, সিআরবিসহ রেলওয়ের অনেক পাহাড়ের ঢালুতে ঝুঁকি নিয়ে অনেকে বসবাস করছেন। ভারী বর্ষা শুরু হওয়ার আগে তাদেরকে সরে যাওয়ার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সতর্ক করে মাইকিং করেছি।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়া গেলেই অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে অথবা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। ২০২২ সালে পাহাড় কাটার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০২১ সালেও ছয়টি মামলা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আদালতের বিভিন্ন আদেশে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড় কাটায় নিষেধ রয়েছে। তারপরও এই নির্দেশনাগুলোর সঠিক প্রতিপালন হচ্ছে না। যদি পাহাড়ে বসতি স্থাপন করতে না দেয় তাহলে এ রকম বর্ষার সময় প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে চিন্তাও করতে হবে না। এ জন্য শুধু বৃষ্টি হলে তোড়জোড় করলে হবে না। সারা বছর এ বিষয়ে প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে।