মে দিবসেও ঘুরছে পিইএচপির কাঁচ কারখানার চাকা

  • ছুটি নেই শ্রমিককর্মচারীদের
  • প্রযুক্তির অজুহাত কর্তৃপক্ষের
মে দিবসেও ঘুরছে পিইএচপির কাঁচ কারখানার চাকা
পিএইচপির কাঁচ কারখানায় মে দিবসেও কাজ করছেন শ্রমিকরা, ছবি : সরবরাহকৃত
18px
Dainik Ishanঈশান/প্রবি/বেবি১ মে, ২০২৬, ১:০৫ PM

স্থাপনের পর গত ২১ বছর ধরে রাত-দিন সমানে ঘুরছে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য শিল্প প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলির কাঁচ কারখানার মেশিনের চাকা। উৎপাদন হচ্ছে কাঁচ। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের নেই কোন ছুটি। এমনকি ভুলুন্ঠিত মে দিবসও। এদিনও ঘুরছে কারখানার মেশিনের চাকা।

চাইলেও এ কারখানা বন্ধ রাখতে পারছেন না পিএইচপি ফ্যামিলি কর্তৃপক্ষ। কারণ, এ কারখানা নাকি একবার বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে সময় লাগবে পুরো দেড় বছর। খরচের অঙ্কটাও কম নয়, প্রায় ৫০০ কোটি টাকা! আর এটাকে কর্তৃপক্ষের অজুহাত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীরা।

শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি, লাভের আশায় কারখানার উৎপাদন থামাতে চাই না কর্তৃপক্ষ। এখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের কোনো অধিকার নেই। কোনো ছুটি নেই। বেতনও কম। চাইলেই কারখানা বন্ধ রাখা যায়। একবার তো কারখানা ঠিকই বন্ধ রেখেছিল। কারখানা বন্ধে প্রযুক্তি একটা অজুহাত।

তাদের দাবি, কাঁচ কারখানা স্থাপনের পর পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পূত্র সেজে গত ১৭ বছর শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছেন। হাসিনার পতনের পরও এই জুলুম কমেনি। মে দিবসেও শ্রমিকদের ঘামের গন্ধে তিনি ব্যাকুল।

আর বিষয়টি জানতে চাইলে পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমির হোসেন সোহেল বলেন, চালুর পর কোল্ড রিপেয়ারিংয়ের জন্য এই কারখানা একবার বন্ধ করতে হয়েছে। কাঁচ কারখানার এ কোল্ড রিপেয়ারিংয়ের পরিভাষা হলো ক্যাম্পেইন।

সময়টা ছিল ২০১৮ সালের জুন মাস। এরপর কারখানাটি পুনরায় সচল করতে সময় লেগেছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে কারখানার ফার্নেস জমাট বেঁধে লোহার মতো কঠিন হয়ে যায়। সেই লোহা কাটতে সময় লাগে ছয় মাস। অন্যান্য মেরামতের কাজ করতে সময় লাগে আরও বছরখানেক। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হয়। পুনরায় সচল করতে সময়ের সঙ্গে খরচ হয় ৫০০ কোটি টাকা। তাই চাইলেই যখন-তখন কারখানা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়া যায় না।

কী সেই প্রযুক্তি :

কাঁচ তৈরি হয় লাইমস্টোন, সিলিকন বালু, সোডা অ্যাশ, সল্ট কেক, ডোলোমাইট ও কোল পাউডার দিয়ে। যার জন্য প্রয়োজন হয় ১৬০০ ডিগ্রির তাপমাত্রা। কোনো অনাকাক্সিক্ষত কারণে এ কারখানা বন্ধ হলে ফার্নেস জমাট বেঁধে লোহার মতো কঠিন হয়ে যায়।

আর সেই লোহা কাটতেই সময় লাগে ছয় মাস। অন্যান্য মেরামতের কাজ করতে সময় লাগে আরও বছর খানেক। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হয়। পুনরায় সচল করতে সময়ের সঙ্গে খরচ হয় বিপুল অঙ্কের টাকাও।

কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সোহেল বলেন, প্রতিদিন ৩০০ টন ধারণক্ষমতার কারখানা এটি। এই কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ইউরোপিয়ান-চায়নিজ লুই ইয়ং প্রযুক্তির এ কারখানায় তিন শিফটে দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করে। তাই রাত-দিন কারখানাটি চালু রাখতে হয়।

কারখানা চালু রাখতে বিকল্প উপায়

কারখানাটি যেহেতু রাত-দিন চালু রাখতে হয় সেহেতু এ জন্য বিকল্প উপায়ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ কারখানার জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ, জেনারেটরসহ প্রত্যেক জিনিসের বিকল্প ব্যবস্থা তিনগুণের সমান রাখা হয়েছে। যেমন একটি মোটরের জন্য তিনটি বিকল্প মোটর রাখা হয়েছে। জেনারেটরের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা রাখা আছে।

শ্রমিক-কর্মচারীর ক্ষেত্রেও একই পথ অবলম্বন করতে হয়েছে। আর এর মধ্যে ছুটি মানে কারখানাটি বন্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই এখানে শ্রমিক দিবস বলেন, ঈদ-পূজা-পার্বণ বলেন, কোনো কিছুতেই নির্দিষ্ট ছকের বাইরে কোন ছুটি নেই শ্রমিক-কর্মচারীদের। এমনকি ঘূর্ণিঝড়, দুর্বিপাক, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কাঁচামালের সংকট এসব থিউরিও অচল এ কারখানায়।

তবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা পহেলা মেসহ তাদেও যে কোনো ছুটির প্রাপ্য পেয়ে যান। এমন একদিনের ছুটির জন্য ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয় বলে জানান এমডি আমির হোসেন সোহেল।

প্রসঙ্গত, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড উপজেলার বাড়বকুন্ড এলাকায় ২০০৫ সালের ২৩ জুন এই কাঁচ কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় ৩০ একর জায়গার ওপর কারখানাটি গড়ে উঠে। কারখানাটিতে প্রতিদিন ৩০০ টন কাঁচ উৎপাদন হচ্ছে।

বিস্মিত ট্রেড ইউনিয়ন

মে দিবসে পিএইচপি ফ্যামলীর কাঁচ কারখানা চালুর রাখার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত। তিনি বলেন, কাঁচ কারখানার উৎপাদনের এমন ধরন আমার জানা নেই। জেনেই কথা বলতে হবে।

তিনি বলেন, মে দিবস মানেই শ্রমিকদের অধিকারের দিন। কলকারখানা বন্ধের দিন। ছুটির সঙ্গে র‌্যালি, সমাবেশ, আলোচনা, সংগীত। ১৩৭ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী চলছে এ রেওয়াজ। কিন্তু যুগের সঙ্গে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে কলকারখানার কাজের ধরন। পাল্টে যাচ্ছে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ত দিনলিপিও। এখানেই প্রযুক্তিই প্রধান হয়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, মে দিবসে যদি কারখানা চালু রাখতেই হয় তাহলে সবেতনে রাখা যায়। ওইদিনের জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী বাড়তি সুবিধাও দিতে হবে যারা কাজ করেন। কাঁচ কারখানা সুবিধা নিশ্চিত করলে সেটি একটি ভালো উদাহরণ।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে ১৮৮৯ সাল থেকে। এ ঘটনার পটভূমি তৈরি হয় ১৮৮৬ সালের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের ধর্মঘট শুরু করে শ্রমিকরা। আন্দোলন তীব্র হয়ে ৪ মে হে মার্কেটে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হয়। বিচারহীনভাবে ফাঁসি দেওয়া হয় কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে। বিশ্ব জুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার স্মরণে দুই বছর পর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে পালিত হচ্ছে এই মে দিবস। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ছুটি বাধ্যতামূলক এই দিনে।

ঈশান/প্রবি/বেবি

মন্তব্য করুন