চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন

নতুন তফসিলে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা

  • বারবার স্থগিতের নেপথ্যে বেলাল
নতুন তফসিলে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা
চট্টগ্রাম চেম্বার ছবি-সংগৃহীত
18px
Dainik Ishanঈশান/প্রবি/খম২৯ এপৃল, ২০২৬, ৮:১৪ AM

টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) পুনরায় তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে এফবিসিসিআইর সালিশি ট্রাইব্যুনাল। একই আদেশে ২০২৫-২০২৬ এবং ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নির্বাচনী তফসিল বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

২২ এপৃল বুধবার এফবিসিসিআই সালিশি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগম এবং সদস্য ছায়েদ আহম্মদ ও এ.এস.এম. কামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, গত বছরের ১১ আগস্ট ঘোষিত তফসিলটি আইনগতভাবে সঠিক ছিল না এবং সময়সীমা পার হওয়ায় সেটি কার্যকারিতাও হারিয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগমসহ সদস্যরা স্বাক্ষরিত এই আদেশে দ্রুত নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়। নতুন তফসিল প্রণয়নে বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২ ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫ অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচন হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য।

এই রায়ের পেছনে ছিল আদালতের সময়সীমা। নির্বাচনসংক্রান্ত একটি সিভিল পিটিশন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকায় আদালত নির্দেশ দিয়েছিল ২৬ এপৃলের মধ্যে বিরোধ নি®পত্তি করতে। সেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল তাদের সিদ্ধান্ত জানায়।

জানা যায়, চেম্বার নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে ভোটার তালিকায় নতুন সংগঠন অন্তর্ভুক্তি এবং আগের তফসিলের বৈধতা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে বিভক্তি তৈরি হয়। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন কয়েকজন ব্যবসায়ী, যারা দাবি করেন, অন্তর্বর্তী পরিস্থিতিতে ঘোষিত তফসিল বর্তমান বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য নয়। এ নিয়ে আদালত থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে।

নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যে কি?

আর এই দীর্ঘ অচলাবস্থার নেপথ্যে যে নামটি বারবার সামনে এসেছে, তিনি হলেন গার্মেন্টসের পণ্য সরবরাহকারী মুহাম্মদ বেলাল হোসেন। তার সাথে অন্য দুজন আবেদনকারী হলেন-চেম্বার নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী একটি গ্রুপের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক ও একই গ্রুপের সদস্য আজিজুল হক।

তবে সালিশী ট্রাইব্যুনালের রায়ে বেলালের এসব কর্মকান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ অভিহিত করে খারিজ করে দেওয়া হয় তার আবেদনটি। এফবিসিসিআইয়ের নিজস্ব সালিশী ট্রাইব্যুনালে বেলালসহ তিনজনের আবেদন নি®পত্তি করে উচ্চ আদালতকে অবহিত করতে দেওয়া হয় নির্দেশ। তারপর সালিশী ট্রাইব্যুনাল শুনানি শেষে মামলাটির বিষয়ে দেওয়া হয় এই পর্যবেক্ষণ।

ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে আরো যে বিষয়টি ওঠে আসে, এই আবেদন করার কোনো আইনগত অধিকার নেই বেলালের। আদালতের এরকম পর্যবেক্ষণের পরও মুহাম্মদ বেলালের মন খারাপ হয়নি। তার দাবি, আবেদন খারিজ করলেও আমার প্রকৃত চাওয়া উপলব্ধি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলা খারিজ হয় যেভাবে

মামলার নথিপত্র ও ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, নিজেকে চট্টগ্রাম চেম্বারের একজন সাধারণ সদস্য এবং হার্বিস কনভার্টিং লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন মুহাম্মদ বেলাল। তবে মামলার শুনানিতে তার সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে পাওয়া গেছে স্ব-বিরোধী তথ্য। কখনও নিজেকে সাধারণ সদস্য, আবার কখনও একটি নির্দিষ্ট ট্রেড গ্রুপের (চট্টগ্রাম গার্মেন্ট এক্সেসরিজ গ্রুপ) সাধারণ স¤পাদক হিসেবে দাবি করছেন তিনি। একই ব্যক্তি দুটি ভিন্ন শ্রেণির সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না এই যুক্তিতে তার আবেদনটি খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফে বেলালের আবেদন খারিজের কারণ উল্লেখ করেছে। ট্রাইব্যুনাল দেখেছে, টাউন অ্যাসোসিয়েশন বা ট্রেড গ্রুপের যে ভোটার তালিকা চ্যালেঞ্জ করেছেন বেলাল, নিজে সেই গ্রুপগুলোর সদস্য নন তিনি। ফলে সেখানে তার কোনো সরাসরি আইনি স্বার্থ নেই।

এছাড়া বেলাল চট্টগ্রাম চেম্বারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলায় নিজের পরিচয় দেন সাধারণ সদস্য হিসেবে। পরে আরেক মামলায় অবস্থান পরিবর্তন করে ট্রেড গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। এভাবে বারবার পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধা নেয়ার প্রবণতাকে আদালত একই ব্যক্তির দুই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে করেছেন সমালোচনা।

আদালতে বেলালের ডিগবাজি

গত ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তার অভিযোগটি প্রত্যাহারের জন্য প্রথম আবেদন করেন তিনি। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মাত্র তিন দিন পর ২৬ অক্টোবর পুনরায় আবেদন করে জানান, ভুলবশত প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া একই বিষয় নিয়ে তিনি একদিকে এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনালে ১২/২০২৫ নং মামলা করেন, অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে ১৬৯৭৬/২০২৫ নং রিট এবং আপিল বিভাগে ৫৭/২০২৬ নং লিভ টু আপিল দায়ের করেন।

বেলালের উদ্দেশ্য

মূলত ট্রেড গ্রুপ থেকে নির্বাচনে লড়তে চেয়েছিলেন বেলাল। কিন্তু চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনী বোর্ড খারিজ করে দেয় তার আবেদনটি। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক আইনি লড়াই শুরু করেছেন তিনি।

তার অভিযোগ, চেম্বারের ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী তফসিল নিয়ে। দাবি, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করেই প্রণয়ন করা হয়েছে ভোটার তালিকা। এ অভিযোগের সূত্র ধরেই বারবার থমকে যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বেলাল বলেন, আমি তো নির্বাচন করছি না। কাকে বাড়তি সুবিধা দিব? কিন্তু বেলালের বড় ভাই এস এম মোহাম্মদ আইয়ুব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন নুরুল হকের ব্যানারে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বেরাচারি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে চট্টগ্রাম চেম্বারও দখলদারমুক্ত হয়। কিন্তু সেই দখলদাররা শুরু করে মামলা-মামলা খেলা। ফলে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়ে হতে পারেনি চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন।

সর্বশেষ ঘোষিত শিডিউল অনুযায়ী চট্টগ্রাম চেম্বারে চার ক্যাটাগরিতে ২৪ পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল ৪ এপৃল। আর সেই পরিচালকদের ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়। কিন্তু এফবিসিসিআই সালিশী ট্রাইব্যুনাল সর্বশেষ ২২ এপৃলের রায়ে সেই তফসিল বাতিল করে দিয়েছে নতুন তফসিলে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম চেম্বারে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছে দুটি প্যানেল। একটি এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্ব ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম। আরেকটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বে সমমনা পরিষদ।

ঈশান/প্রবি/খম

মন্তব্য করুন