২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে চট্টগ্রামের রাউজানে এ পর্যন্ত ২৩টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৯ জনই বিএনপি নেতাকর্মী। অবস্থাভেদে মনে হচ্ছে বিএনপি নিধনে পরিকল্পিত মিশন চলছে রাউজানে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কারা চালাচ্ছে হত্যাযঞ্জের এই মিশন। পুলিশের অভিযানে এসব হত্যা মামলার অর্ধশতাধিক আসামিও আটক হয়েছে। হয়েছে বিপুল অস্ত্র উদ্ধারও। এরপরও এত অস্ত্র কোথা থেকে আসছে। কোথা থেকে উৎপন্ন হচ্ছে এত খুনি। নাকি পুলিশের আইনি ব্যবস্থায় কোন গাফিলতি রয়েছে।
কেন থামছে না হত্যকান্ডের ঘটনা। নাকি আশির দশকে বর্বর সেসব হত্যাকান্ডের যুগে ফিরে গেছে রাউজান। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের মুখে উঠে আসে রোমহর্ষক সব তথ্য। আর বিষয়টি মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমমিশ খাচ্ছে খোদ পুলিশ প্রশাসনও।
এমন স্বীকারোক্তি মিললেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কোন কর্তাই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্ত মানলে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, রাউজানে যেসব হত্যাকান্ড ঘটছে তা মোটেও রাজনৈতিক হত্যাকান্ড নয়। এর পেছনে রয়েছে বালুমহাল দখল, পাহাড় কাটা, মাটি কাটা, চাদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রণ। যা করতে রাজনীতিকে ব্যবহার করছে শুধু।
তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা একক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য সৃষ্টি করে নীরবে এসব অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়েছে। এসময় এদের কোন প্রতিদ্বন্ধি ছিল না। বিএনপিসহ অন্য যে কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাদের ভয়ে এলাকাছাড়া ছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্রেপ্তারের ভয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি ফজলে করিম চৌধুরীসহ নেতাকর্মীরা গাÑঢাকা দেয়। এরপর এসব অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাদের সহযোগীতা করছে আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী কিছু কর্মী।
যাদের মধ্যে দখলদারিত্ব নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে দু‘পক্ষের মধ্যে লেগেই আছে খুনোখৃুনি। ৫ আগষ্টের পর রাউজানে এ পর্যন্ত ২৩টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর এই হত্যাকান্ড শুধু রাউজানে ঘটেছে তা নয়, পার্শ্ববর্তি রাঙ্গুনিয়াও তিনটি, চট্টগ্রাম শহরেও ৭টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। সবগুলোর সাথে রাউজান কানেকশন।
বালুই মূল বিরোধ
চট্টগ্রামে বালুর উৎস হচ্ছে কর্ণফুলী ও হালদা নদী। আছে আরও কয়েকটি ছোট-বড় খাল। যেখান থেকে প্রতিনিয়ত তোলা হচ্ছে বালু। শুধুমাত্র কর্ণফুলী নদি থেকে প্রতিরাতে কোটি টাকার বালু তুলছে দূর্বৃত্তরা। পাহাড় কাটছে। চাঁদাবাজি করছে। করছে মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা।
তাদের হাতে এতো অস্ত্র উৎস হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সন্ত্রাসীরা। যার কারণে পুলিশ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেও কোন কিনারা পাচ্ছে না। আর খুনিদের আটক করলেও কমছে না খুনি। কারণ খুনি উৎপাদনের কারখানা হচ্ছে রাজনীতি।
এখানে মূল সমস্যা হলো অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িত নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক পরিচয় দিলেও শীর্ষ নেতারা তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ করেন না, যেভাবে আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি নিজ হাতে ভাগবাটোয়ার করতেন সব।
কিন্তু রাউজানের বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এসব নিয়ন্ত্রণ তো দুরের কথা তিনি উল্টো সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ প্রশাসনকে বারবার তাগাদা দিয়ে আসছেন। একইভাবে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারও হাঁটছেন একই পথে। তিনিও সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে কঠিন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে তাগাদা দিচ্ছেন।
যার কারণে আধিপত্য বিস্তারে একের পর এক খুন হচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। এসব হত্যাকান্ড বিএনপি নিধনের কোন মিশন নয়। বরং বিএনপি নেতাকর্মীরাই বিএনপি নেতাকর্মীদের খুন করছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা এসব থেকে দূরে থাকলেও কলকাঠি নাড়ছে তাদের পিএ‘রা। যাদের প্রশ্রয়ে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও চট্টগ্রাম শহরে খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। যাদের কারণে গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকারের মধ্যে অবিশ্বাস গেড়ে বসেছে। এই বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষরা হামলা করে গোলাম আকবর খোন্দকারকেও রক্তাক্ত করেছে।
পুলিশের তথ্য মতে, গত ২৪ এপৃল শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জঙ্গল রাউজান এলাকায় খুন হন কাউসারুজ্জামান বাবলু (৩৬) নামে এক বিএনপি কর্মী। বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তার একদিন পর রবিবার (২৬ এপৃল) দিবাগত রাতে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের লেংগা বাইল্যার ঘাটা এলাকায় নাছির উদ্দীন (৫৫) নামে আরেক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সর্বশেষ এই দুটি খুনের ঘটনায় ইতোমধ্যে প্রধান সন্দেহভাজনসহ পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান।
তাঁর ভাষ্যমতে, গত দু‘দিনে রাউজানে দুটি মার্ডার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ যে ঘটনা, সেটা হয়েছে সন্ত্রাসী রায়হান গ্রুপ ও তার প্রতিপক্ষের বিরোধের কারণে। যে মারা গেছে, সে রায়হান গ্রুপের লোক। তার বিরুদ্ধেও পাঁচ ছয়টা মামলা আছে। এরকম বেশ কয়েকটা মার্ডার হয়েছে সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্বের জেরে। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এই সন্ত্রাসীগুলোকে গ্রেপ্তার করা।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান বলেন, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ কোন হত্যাকান্ডের ঘটনা মোকাবেলায় পুলিশের কোন গাফিলতি নেই। খৃুনিদের গ্রেপ্তারে তৎপর পুলিশ। রাউজানে ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। অপরাধ যে কারণেই ঘটুক, যারা অপরাধ করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ফিরে দেখা আশির দশক
এরশাদ আমলের কথা। চট্টগ্রামের রাউজানে লাশ পড়ত নিয়মিত। রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে ভিজত রাউজানের মাটি। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর লাশ পড়া কিছুটা বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী কথিত ক্রসফায়ারে মারা পড়ে। অনেকে পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। এরপর রাউজানের সন্ত্রাসী জনপদের তকমা খানিকটা ঘুচে।
সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন ফজলে করিম এমপি। যদিও তিনি বিএনপি সরকারের মতো নয়, নিজের মতো করেই ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে এ কাজটি করেছিলেন। এ সময়ে যত বড় প্রভাবশালী বা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হোক তাঁর রাজ্যে কারও টুঁ শব্দ করার সুযোগ ছিল না।
এরপর অন্তবর্তি সরকারের সময় থেকে এ পর্যন্ত যেভাবে একের পর এক হত্যাকান্ড শুরু হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে রাউজানে আবারও ফিরে এসেছে সেই আশির দশক। মুছে যাওয়া সন্ত্রাসের জনপদ তকমা আবার ফিরে এলো রাউজানে।
সেই সময়ের ছাত্রনেতা ও রাউজান পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান দেবাশীষ পালিত তুলে ধরলেন ইতিহাসের খানিকটা। ১৯৮৯ সালের ৫ এপৃল। রাউজান কলেজের সাবেক-বর্তমান দুই ভিপি ফখরুদ্দিন বাবর ও মুজিবুর রহমানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। উভয়ে ছিলেন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সেই সময়ের জনপ্রিয় নেতা। তাদের খুনের প্রতিবাদে হরতাল, সভা-সমাবেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামে।
দেবাশীষ পালিতের ভাষ্য, তখন রাউজানে কোনো হত্যাকান্ড হলে তার জেরে আতঙ্কের শহরে পরিণত হত চট্টগ্রাম। নগরীর আন্দরকিল্লায় জেনারেল হাসপাতালের পাহাড়ে ছিল মর্গ। রাউজানে নিয়মিত খুনখারাবি হত আর লাশ নেওয়া হত সেখানে। মর্গের লাশের ওপর উড়ত শহুরে কাক।
উপজেলার কদলপুর গ্রামের বয়োজেষ্ঠ্য সুলতান আহমেদ জানান, আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে অন্তত এক দশক পর্যন্ত রাউজানের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। মানুষ রাউজানের নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠত। সে সময় একনাগাড়ে ২৭টি হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেছিল রাউজানে। নিহতদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী ছিল। নীহার রঞ্জন বিশ্বাস নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল রাউজান থানার পাশেই।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিভিন্ন পদে কাজ করা সাবেক এক কর্মকর্তার ভাষ্য, সে সময় রাউজান অশান্ত হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক কারণে। এ সময় একদিকে ছিল প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার লড়াই। অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও পাল্টা আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জোর-জবরদস্তি। সেই লড়াইয়ে হারায় অনেক অকাল প্রাণ।
অথচ অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের স্মৃতিধন্য রাউজান উপমহাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, আবার পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। রাজনীতির অনেক প্রবাদপ্রতিম নেতা, এমপি, মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, মনীষী জন্ম দিয়েছে এই রাউজান।
রাউজান আবার কেন অশান্ত, প্রশ্ন ছিল বিএনপির প্রয়াত চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকারের কাছে। বললেন, সেই সময়ে (আশির দশক) যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাউজানে হত্যাকান্ড হয়েছিল, এখনো তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকান্ড হচ্ছে। আমি এর বেশি কিছু বলব না।
একই প্রশ্নের জবাবে, ব্যস্ত থাকার কথা বলে এড়িয়ে যান বিএনপিদলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।