জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হলেও গণপরিবহনে যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। আর এর মধ্যে চট্টগ্রামে অনেক গণপরিবহনে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে বাসে বাসে হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক।
হেলপার-চালকরা বলছেন, জ্বালানি তেল বাড়তি দামে কিনছেন, এ কারণেই ভাড়া বাড়িয়েছেন। যাত্রীদের তর্ক-বিতর্ক এড়াতে অনেক গণপরিবহন রাস্তায়ও নামেনি। আমরা যাত্রীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে বাস নামিয়েছি। সে হিসেবে ভাড়া নিচ্ছি। এমন স্বীকারোক্তি তাদের।
হেলপার-চালকরা জানান, সোমবার (২০ এপৃল) সকাল থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গন্তব্যে প্রত্যেক স্টপেজ হিসেবে সর্বনিম্ন ৫ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে কোন কোন গণপরিবহন এখনো সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। তাই তারা গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রেখেছেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও সরকারের পক্ষ থেকে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বাস ভাড়া বাড়ানোর আলোচনা চলছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের গণপরিবহনগুলো ঘোষণার আগেই নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন যাত্রীদের কাছ থেকে।
যাত্রীরা জানান, নগরীর বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত এতদিন ১৫ টাকা করে ভাড়া আদায় করত ডিজেলচালিত ১০ নং গণপরিবহনের বাসগুলো। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে এই পথের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে প্রত্যেক স্টপেজে ৫ টাকা বাড়িয়ে। এই পথে ৭টি স্টপেজ রয়েছে। তবে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদের সরাসরি যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। এ নিয়ে দিনভর ১০ নম্বর বাসগুলোতে ভাড়া আদয় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়।
ফয়সাল হোসেন নামে ১০ নং বাসের এক যাত্রী বলেন, এতদিন ১৫ টাকা ভাড়া নিতো। এখন ২০ টাকা চাচ্ছে। প্রত্যেক স্টপেজ ভেদে ১০ টাকার বদলে ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫ টাকা ভাড়া নিচ্ছে। সে হিসেবে ৭ স্টপেজে ৩৫ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যা রীতিমতো পকেট কাটার মতো।
আনোয়ার শাহদাত নামে আরেক যাত্রী বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার থেকে জামাল খান মোড় পর্যন্ত এক কিলোমিটার দুরত্ব। এই দূরত্বে আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। এখন ৫ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া ১৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এটা ডাকাতি ছাড়া কিছুই নয়।
এদিকে সিট ভিত্তিক বিরতিহীন বাস সার্ভিসের নামে পরিচালিত মেট্রো প্রভাতি সোমবার সকাল থেকে প্রত্যেক স্টপেজে ১০ টাকার স্থলে ২০ টাকা ভাড়া আদায় করছে। সিটের বাইরে অসংখ্য যাত্রী নিয়েও তারা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে দিগুণ বাস ভাড়া আদায় করছে। কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা এয়ারপোর্ট সড়কের প্রতিটি স্টপেজে দাড়িয়ে যাত্রী তোলে এই বাস সার্ভিস। যা যাত্রীর সাথে পুরোপুরি প্রহসন বলে মন্তব্য করেছেন ভুক্তভোগী যাত্রীরা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের অধিকাংশ গণপরিবহনই ঘোষণার আগেই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে যারা ভাড়া নিয়ে বিতর্ক হবে বলে মনে করছেন তারা গণপরিবহন নিয়ে রাস্তায় বের হননি। এতে নগরজুড়ে গণপরিবহন সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নিয়মিত যাত্রীরা।
সোমবার বিকেলে নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথার মোড়ে সাক্ষাত হওয়া শারমিন আক্তার নামে এক যাত্রী বলেন, আমি নগরীর বায়েজীদ এলাকায় একটি রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। প্রতিদিন সকালে যায় বিকেলে আসি। যাওয়ার সময় বাসে ১৫ টাকা, আসার সময় ১৫ টাকা খরচ হলেও সোমবার সকালে সড়কে বাস না পেয়ে সিএনজি অটোরিক্সায় যেতে হয়েছে। এতে আসা-যাওয়ায় আমার ৩০০ টাকা খরচ হয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে একাধিক গণপরিবহনের মালিক কোনরকম কথা বলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মালিক বলেন, তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার কালক্ষেপণ করবে এটা তো উচিত না। তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার সাথে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণাও দেওয়া উচিত। তা হলে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে যাত্রীদের সাথে গণপরিবহনের কারও কোনরকম ভুলবুঝাবুঝি হত না।
একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম জেলা গণপরিবহন মালিক ও চালক সমিতির সদস্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পর আমরা সরকার পক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)এর সাথে দু‘দিন বৈঠক করেও ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা আদায় করতে পারিনি। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে চেয়ে আছি, সরকার আমাদের গণপরিবহন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে চিন্তা করছেন বলে তো মনে হচ্ছে না। সরকার ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দিলে আমরা গণপরিবহন রাস্তায় নামাব।
প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধে সৃষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে শনিবার (১৮ এপ্রৃল) রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সব ধরনের জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ স¤পদ বিভাগ। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করে মালিকরা। দাম বাড়ার প্রথমদিনই রোববার (১৯ এপৃল) রাতে পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বসে বিআরটিএ। বৈঠকে মালিকপক্ষের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
তবে সোমবার (২০ এপৃল) সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে ওই সময় সরকারি সিদ্ধান্তে পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়।
ওই সময় দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা বিভিন্ন সময় ভাড়া বাড়ানোর তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্ত আর ভাড়া বাড়ায়নি সরকার।