বৈশাখের ভর দুপুর। মাথার ওপর সূর্য যেন অগ্নিবর্ষণ করছে। কিন্তু চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানের উত্তাপ ছাপিয়ে গেছে সেই অগ্নিবর্ষণ। মানুষের উন্মাদনার কাছে হার মেনেছে বৈশাখের সেই তপ্ত দুপুর।
শনিবার (২৫ এপৃল) বেলা শেষে এল শান্তির বার্তা। এবারের ১১৭ তম বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন মো. শরীফ। যিনি সবার কাছে ‘বাঘা’ শরীফ নামে পরিচিত। আর তাতে তার হয়ে যায় হ্যাটট্রিক। খেলায় রানারআপ মো. রাশেদ।
সূত্রমতে, এবারের বলীখেলায় অংশ নিয়েছিলেন ১০৮ জন বলী। নবীন থেকে প্রবীণ সবার লক্ষ্য ছিল একটাই, লালদীঘির শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াইটি গিয়ে ঠেকে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী গতবারের চ্যাম্পিয়ন মো. শরীফ ও মো. রাশেদের মধ্যে।
ফাইনালে রিংয়ের চারপাশ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। ঢোলের বাদ্য আর দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকারে মেতে উঠেছে পুরো এলাকা। লড়াই শুরু হতেই দেখা গেল কৌশল আর শক্তির অপূর্ব সমন্বয়। কখনো রাশেদ আক্রমণ করছেন, তো কখনো শরীফ তা দুর্দান্ত দক্ষতায় সামলে নিচ্ছেন।
এভাবে চলল টানা ২৫ মিনিট। শেষ মুহূর্তে হুট করেই নিজের কৌশল বদলে ফেললেন শরীফ। রাশেদকে ভারসাম্যহীন করে এক নিপুণ প্যাঁচে মাটিতে ফেলে দিতেই রেফারির বাঁশি বেজে উঠল। বাঘা শরীফ টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের আধিপত্য আরও সুদৃঢ় করলেন।

অরণ্য তৌফিক
এর আগে খেলায় বাজিমাত করেছেন ঢাকা হরাইজন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী অরণ্য তৌফিক। ১৬ বছর বয়সী এই কিশোর হারিয়ে দিয়েছেন তার চেয়ে ১২ বছর বেশি বয়সের মোহাম্মদ মানিককে।
শনিবার ঢাকা থেকে লালদীঘির মাঠে এসে পৌঁছান তৌফিক। সঙ্গে এসেছেন তার কোচ সামির। তৌফিক কুস্তি ও রেসলিং পছন্দ করেন ছোটবেলা থেকেই। ঢাকায় মাঝেমধ্যে খেলেন। এবার শখের বশে জব্বারের বলীখেলায় আসলেন প্রথমবার।
তৌফিক ও হালিশহরের মানিকের দ্বৈরথটি এক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়। রিং থেকে নামার মুখেই তিনি জড়িয়ে ধরেন কোচ সামিরকে।
তৌফিক বলছিলেন, ‘আমার চেয়ে অনেক স্থুলকার বড় একজনের সঙ্গে খেলেছি। সাহস করে নেমেছি। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও সাহস হারাইনি। শেষপর্যন্ত জিতে গেছি। ভালো লাগছে।’
ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা তৌফিক। বাবা তৌফিকুল আলম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তা। মা রোকসানা চিকিৎসক। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তৌফিক বড়।
তৌফিক জানান, তার বাবা মা তাকে খেলার বিষয়ে উৎসাহ দেন। টিভিতে নিয়মিত রেসলিং দেখেন তিনি। ভবিষ্যতে একজন বড় কুস্তিগির হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
তৌফিক এবার জব্বারের বলীখেলার সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রতিযোগী। জেতার পর দারুণ উচ্ছ্বসিত। ‘আগে অনেক শুনেছি এ বলীখেলার কথা। এখন সামনাসামনি দেখলাম।’
শতবর্ষী আবদুল জব্বার বলীখেলা এবার ১১৭ বছরে পা দিল। এবার শতাধিক বলী অংশ নেন। ১৯০৯ সালে বদরপাতির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলীখেলার প্রচলন করেন। তখন উদ্দেশ্য ছিল নিছক বিনোদন নয়, বরং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের তরুণদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও সাহসী করে গড়ে তোলা।
১১৪ বছর ধরে প্রতিবছর ১২ বৈশাখ এই আয়োজন চট্টগ্রামের মানুষের আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লালদীঘি ঘিরে আয়োজিত কয়েক কিলোমিটারের এই বৈশাখী মেলায় কেউ গামছা বেঁধে, কেউ ছাতা হাতে, আবার কেউ গাছের ছায়ায় ঠাঁই নিয়ে চাতক পাখির মতো বেলা দেখেছেন।