রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল গিলে খাচ্ছে মাফিয়া খ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন রিপন। সিন্ডিকেটে জড়িত খোদ রেলওয়ের রতি-মহারতি কর্মকর্তারা। যাদের কুটকৌশলে হরদম লুট হচ্ছে সরকারি অর্থ। হারাচ্ছে রাজস্ব। এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত মিলেছে সম্প্রতি।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চলের বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক ট্রেন ৫৫১ নং, ৫/৬ রাজশাহী কমিউটার, ৫৪৫ লোকাল, ২৩/২৪ নং রকেট মেইল, ২৭/২৮ ঘাগট মেইল, ১৫/১৬ নং মহানন্দা এক্সপ্রেস, ৫৮৫ লোকাল, ২৫/২৬ নকশি কাঁথা এক্সপ্রেস, ৫১৩/৫০৬/৫০৫/৫০৮/৫০৭, ১৯/২০ বগুড়া এক্সপ্রেস এবং ২১/২২ পদ্মরাগ কমিঊটার সর্বশেষ ২০০৯ সালে টেন্ডার করা হয়েছিলো।
২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত রেলওয়ের মাফিয়া খ্যাত সালাউদ্দিন রিপন এই ট্রেনগুলো বেসরকারিভাবে বৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। যখন এই ট্রেনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তখন ২০১৩ সালে ধুরন্ধর সালাউদ্দিন রিপন হাইকোর্টের একটি স্টে অর্ডার বের করেন যাতে পরবর্তীতে আর কোন নতুন দরপত্র আহ্বান না করা যায়।
এমতাবস্থায় ২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের এখন অব্দি এই পাঁচটি ট্রেনের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ক্ষমতার পালাবদল হলো কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতা সালাউদ্দিন রিপন এর আধিপাত্য এক চুল পরিমানও কমেনি। কারন সালাউদ্দিন রিপনের সিন্ডিকেটে জড়িত খোদ পশ্চিমাঞ্চল রেলের রতি-মহারতি কর্মকর্তারা। রেলওয়ের কালো বিড়ালদের এই সিন্ডিকেট রিপনের পক্ষে ঢাল হয়ে দাড়াচ্ছে।
কর্মকর্তাদের দায় ঠেকানোর চিঠিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রেলভবন ঢাকা থেকে উপপরিচালক (টিসি) মো. আনসার আলী ৮ জানুয়ারি ২০২৫ এ চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পশ্চিম), রাজশাহী বরাবর স্টে অর্ডার বাতিল এর জন্য ব্যবস্থা নিতে একটি চিঠি প্রেরণ করা হয়। কেন এই পাঁচটি ট্রেনের স্টে অর্ডারগুলো এখনো ওঠানো হয়নি এবং আইন কর্মকর্তাগণ এর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮/১/২৫ ইং তারিখের চিঠিটি ৯/০১/২৫ তারিখে চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পশ্চিম) রিসিভ করেন। কিন্তু এক বছর চার মাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও এখনো পর্যন্ত চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার পশ্চিম এবং আইন কর্মকর্তাগণদের কাছ থেকে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
আরো জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী লিজকৃত এই পাঁচটি ট্রেন যাওয়া এবং আশা মিলিয়ে রেক (বগি) ক¤েপাজিশন (৮/১৬), কিন্তু তারা চালায় আসা-যাওয়া মিলিয়ে (৫/১০)। ট্রেনে এই রেক কম চালানোর কারণে ট্রেন হারাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব।
কারণ খতিয়ে দেখা গেছে, এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট যার মধ্য অন্যতম খুলনা স্টেশনের মো. শামীম (হেড টিএক্সআর) এবং খুলনার স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ জাকির। যাদের সহযোগিতায় ট্রেনের বগিগুলোকে ড্যামেজ দেখানো হয়। যার কারণে কম সংখ্যক বগি দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করা হলেও কিন্তু যাত্রীর কোন তারতম্য ঘটে না যাত্রীর ফ্লো ঠিকই থাকে।
এখানে যেহেতু সরকার সিট অনুযায়ী ভাড়া পায়, যার ফলশ্রুতিতে সরকার হারায় রাজস্ব এবং সালাউদ্দিন রিপন এর প্রতিষ্ঠান এর মুনাফা ঠিকই পেয়ে যায়। এমন একাধিক বিলের কপি দৈনিক ঈশান কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। যা দিয়ে অনায়াসেই সালাউদ্দিন রিপনসহ তার সহযোগী রেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। তবে এ যাবত তেমন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলের আরেক মাফিয়া মোহাম্মদ হান্নান সালাউদ্দিন রিপনের সকল অর্থনৈতিক লেনদেন করে থাকেন। যার মধ্যে প্রতিদিন দশ হাজার টাকা করে পান মো. শামীম হেড টিএক্স আর এবং স্টেশন মাস্টার মো. জাকির।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মহানন্দা (রহনপুর টু খুলনা), নকশী কাঁথা (খুলনা টু ঢাকা) এবং রকেট (খুলনা টু চিলাহাটি) এই তিনটি ট্রেনে তিনটি করে বগি কম দেওয়া হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী অফিসের সিসিএম এর এডমিন অফিসার মোহাম্মদ মাহবুব হোসেন ও এসিওপিএস (পি) আব্দুল আউয়াল এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। প্রতিটি ট্রেন ইচ্ছাকৃতভাবে লেট করার কারণে রেলওয়ের কন্ট্রোল এর কর্মকর্তারা অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পান। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, রেলওয়ের আইন কর্মকর্তা কি সালাউদ্দিন রিপন এর সাথে আঁতাত করেছে?
জানতে চাইলে সালাউদ্দিন রিপন এর ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ হান্নান বলেন, পুরো পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা আমি একা তদারকি করি না। রহনপুর ও চিলাহাটি অফিসে অন্য লোক আছে। সিন্ডিকেটকে টাকা দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে হান্নান বলেন. অনেক মাস আমাদের লাভই হয় না। বগি কমানোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রেল পুরো বগি দিলে আমরা নিতে বাধ্য। পুরো পশ্চিমাঞ্চলে এফ এস বগি আছে ৩টি।
খুলনা স্টেশনের হেড টি এক্স আর মো. শামীম টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, বগি কম দেয়ার ব্যাপারেও তার কোন হাত নেই। তবে সালাউদ্দিন রিপন এর ট্রেনগুলোতে বগি কম যায় এবং অন্যদের ট্রেনে বগি ঠিকমতো যায় কেন এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
খুলনা স্টেশন মাস্টার মো. জাকির পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, হান্নান এর একটি টাকাও আমার পকেটে কোন সময় আসেনি। কোন সিন্ডিকেটের সাথে আমি জড়িতও না। তবে সিন্ডিকেটে রেল গিলে খাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।
পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী অফিসের সিসিএম এর এডমিন অফিসার মোহাম্মদ মাহবুব হোসেন বলেন, বগি কমানোর ক্ষমতা আমাদের নেই, এটা মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের। তিনি আরো বলেন ৫ আগস্টের পরে অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা মহোদয় নির্দেশ দিলো ট্রেনগুলো বাতিল করার জন্য। আমরা রিপোর্টও দিলাম। কিন্তু রিপন হাইকোর্টে আবেদন করে স্টে অর্ডার নিয়েছে।
এসিওপিএস (পি) আবদুল আউয়ালকে ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।