জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে পাউবোর মেগা প্রকল্পের পিডি হলেন হাসান মাহমুদ!
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ-নদী পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারেজ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। গত ১৩ মে একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত।আর এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পিডি হিসেবে নিয়োগ পেলেন বাপাউবো ফেনী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বগুড়ার সন্তান হাসান মাহমুদ। গত ২৭ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখার অফিস আদেশ অনুযায়ী তিনি পাউবো ফেনী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করবেন।আর এই নিয়োগের পরই উঠেছে প্রশ্ন। কারণ প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী পিডি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গ্রেডের কর্মকর্তা না হয়েও তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কীভাবে? অথচ এই দায়িত্ব পাওয়ার মতো বাপাউবোতে আরো ৬১ জন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী রয়েছেন। যাদের ডিঙিয়ে হাসান মাহমুদকে নিয়োগ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।এছাড়া তার বিরুদ্ধে বগুড়া ও ভোলা বাপাউবোতে দায়িত্বপালনকালে কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ফ্যাসীবাদের দোসর হিসেবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ বাপাউবো শাখার ২০২২-২৪ টার্মের ৩৪ জনের কমিটিতে নির্বাহী সদস্য হিসেবেও কমিটিতে ছিলেন।আর এত অভিযোগের পরও পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখার অফিস আদেশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে দূর্নীতির বরপূত্র এই হাসান মাহমুদকে পাউবো ফেনী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করা হয়েছে। যা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে বাপাউবোজুড়ে।বাপাউবোর প্রকৌশলীদের একটি অংশের অভিযোগ, হাসান মাহমুদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ ৬১ জন কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে হামান মাহমুদকে পিডি করা হয়েছে। বাপাউবোর জ্যেষ্ঠতা তালিকার ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান ৬২ বলা হয়েছে। যদি সত্যিই ৬১ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক যুক্তি কী ছিল-এ প্রশ্নের উত্তর পানি স¤পদ মন্ত্রণালয় ও বাপাউবোর কাছ থেকেই আসা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।পিডি নিয়োগে নিয়মে যা আছেবাপাউবো সূত্র জানায়, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় প্রকল্প পরিচালকের পদটি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় গ্রেডের জন্য নির্ধারিত বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ হাসান মাহমুদ বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যেটি চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। বাপাউবোর সিভিল ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬২ এবং তাঁর আগে ৬১ জন কর্মকর্তা থাকার দাবি করা হয়েছে।এখানেই মূল প্রশ্ন। যদি অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে পিডির পদ নির্দিষ্ট গ্রেডের কর্মকর্তার জন্য হয়ে থাকে, তাহলে চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে কোন বিধান ও প্রশাসনিক যুক্তিতে ওই দায়িত্ব দেওয়া হলো? বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজন প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, জনবল কাঠামো, সংশ্লিষ্ট নোটশিট এবং নিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রকাশ করা দরকার।হাসান মাহমুদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পিরিতির নেপথ্যে কী?হাসান মাহমুদের নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে এমন দাবি রয়েছে। ২৭ আগস্ট পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-২ শাখা থেকে আদেশটি জারি হয়। উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুর রহিম রিপন তাতে স্বাক্ষর করেন।এরপর থেকে হাসান মাহমুদকে পিডি নিয়োগের নেপথ্যে কারা রয়েছে বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে বাপাউবোজুড়ে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে উত্তর অঞ্চলের কোনো এক প্রতিমন্ত্রীর ইশারায় সাবেক ছাত্রলীগের নেতা প্রকৌশলী হাসান মাহমুদকে পিডি করা হয়েছে।আরেকটি সুত্র জানায়, পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছুদিন পুর্বে পেশনে যোগদানকারী অতিরিক্ত সচিব জনাব মো. এনামুল, পানি স¤পদ সচিব মো. শাহাবুদ্দিন এবং বাপাউবোর ডিজি মো. রুহুল আমিন আওয়ামী ফ্যাসীবাদের দোসরের পক্ষে কাজ করেছেন। হাসান মাহমুদকে পিডি নিয়োগে তাদেরও ভূমিকা থাকতে পারে।আবার হাসান মাহমুদের বাড়ি বগুড়ায়, এ কারণে পিডি নিয়োগ বিভিন্নভাবে স্বজনপ্রীতির গুঞ্জনও উঠেছে। নয়তো মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সমালোচনা নিয়ে দপ্তরের প্রতিটি টেবিলে কানাঘুঁষা চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।তবে পিডি নিয়োগে হাসান মাহমুদের নাম কে প্রস্তাব করেছেন? কোন দপ্তর সুপারিশ করেছিল? কোন নোটশিটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? কার অনুমোদনে তাঁকে চতুর্থ গ্রেড থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো? এই চারটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ পেলেই বিতর্কের বড় অংশের অবসান হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগসূত্র জানায়, হাসান মাহমুদ ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বগুড়া পানি উন্নয়ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ওই সময়ের দায়িত্ব পালন নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে (আরএফকিউ, ডিপিএমসহ) বিভিন্ন কাজ দেওয়া হয়েছিল। পারিশা ট্রেড সিস্টেম নতুন লাইসেন্সধারী একটি প্রতিষ্ঠানকে বিপুলসংখ্যক কাজ দিয়ে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।এছাড়া ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোলা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২, চরফ্যাশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময় তৎকালীন ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং কমিশন বাণিজ্য ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন কাজের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আছে।হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে ফাইল ধামাচাপা দেয় বলেও অভিযোগ উঠে। প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বসিলায় অবস্থিত মধু সিটিতেও হাসান মাহমুদ তার ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগের অর্থের উৎস ও প্রকৃত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য সঠিক তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানা যায়।এ অবস্থায় হাসান মাহমুদকে পিডি নিয়োগে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। প্রকল্পটি ৩৪ হাজার ৪৯৭.২৫ কোটি টাকা এবং এটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্পের অফিস আদেশে সরকারি আর্থিক ও পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণের পাশাপাশি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সামনে রয়েছে বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবহার। এই অবস্থায় পিডি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে না রেখে নথিভিত্তিক প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুসন্ধানে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।ফ্যাসীবাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় চাকরিতে নিয়োগহাসান মাহমুদ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং স¤পন্ন করে ২০০৭ সালে বাপাউবোর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। তবে তাঁর নিয়োগ পরীক্ষায় অবস্থান, কোটায় নিয়োগের দাবি কিংবা ৬৩ জনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ৫০-এর পরে ছিল বলে অভিযোগ উঠে।বাপাউবোর ২০০৭ সালের নিয়োগ পরীক্ষার মেধাতালিকা, কোটা-সংক্রান্ত নথি এবং নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি কাগজপত্র প্রকাশ করা হলে চাকরিতে নিয়োগের অনিয়মও বেরিয়ে আসবে। ফ্যাসীবাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে পাউবোর চাকরিতে তার নিয়োগ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।চাকরিতে যোগদানের আগে হাসান মাহমুদ চুয়েট ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। যোযগদানের পর বাপাউবো বঙ্গবন্ধু পরিষদের ২০২২-২৪ মেয়াদের কমিটিতে হাসান মাহমুদের নাম নির্বাহী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই কমিটির তালিকায় তাঁর অবস্থান ৩০ নম্বর নির্বাহী সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য পাউবো ফেনী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের মুঠোফোনে একাািধকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস দিলেও তিনি সাড়া মেলেনি।এমনকি বাপাউবোর মহাপরিচালক (ডিজি) মো. রুহুল আমিনও ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁদের কারো বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।