পারমাণবিক বিদ্যুতের পথে বাংলাদেশ

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা প্রক্রিয়া শেষে দেশের প্রথম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুরু হয়েছে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম। এর মধ্য দিয়েই কেন্দ্রটিতে ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ উৎপাদন। নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
মঙ্গলবার (২৮ এপৃল) দুপুরে পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। এই অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে দেশের জ্বালানি খাতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর রি-অ্যাক্টর। এখানেই লোড হবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় প্রচুর তাপশক্তি। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। এটি চলে একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে। যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা হয় প্রতিটি ধাপ। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ।
এই পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রি-অ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য লাগবে প্রায় ৩৪ দিন। পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ৩ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে শুরু হবে বিদ্যুৎ সরবরাহ।
পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস। দুটি ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এখন প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে নতুন গতি আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। সুযোগ আছে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত আয়ু বাড়ানোর। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণচুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের বড় সুবিধা এর জ্বালানি দক্ষতা বেশি। একটি এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন। সেখানে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লাগে প্রতি বছর মাত্র ২৭ টন।
একই সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে বছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সমপরিমাণ। শুধু বড়পুকুরিয়া বাদে বাকি সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি করতে হয়, যা ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমও চলছে ধীরগতিতে। ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যান্য খাতেও রয়েছে গ্যাস স্বল্পতা। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্ব জুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বাস্তবতায় এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিবেচিত। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে। রূপপুরে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করবে।
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রাথমিক ধারণা আসে ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য ১২টি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুর উপযুক্ত স্থান নির্বাচিত হয়। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সফরাটম’ কর্তৃক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ভিত্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রি-অ্যাক্টর চালু করে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তিসই হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রসাটমের মধ্যে সই হয় আরেকটি চুক্তি। ওই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত।