বুকসমান পানিতে ডুবলো চট্টগ্রাম

চার ঘন্টার বজ্র বৃষ্টিতে বুকসমান পানিতে ডুবে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক। ফলে যানবাহন ঠাঁই নিয়েছে ফ্লাওভারে। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। দুর্ভোগে পড়ে এসএসসি পরীক্ষায় থাকা পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
মঙ্গলবার (২৮ এপৃল) বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে পানি জমে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ১১টার দিকে বৃষ্টি কম থাকলেও সাড়ে ১২টার দিকে আবার ভারী বৃষ্টি হয়; যা দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
নগরীর আমবাগান আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ বিজন রায় বলেন, সকাল নয়টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিন ঘণ্টা পরপর বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হিসাব করা হয়। পরবর্তী অবজারভেশনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জানা যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, চকবাজার, আগ্রাবাদ, রাহাত্তারপুলসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে পানি সড়ক ও বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
নিচু এলাকাগুলোতে পানি বুকসমান হওয়ায় নগরীর যানবাহনগুলো ঠাঁই নেয় শহরজুড়ে বিস্তৃত সবকটি ফ্লাইওভারে। ডুবে গিয়ে অনেক যানবাহন মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েছে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষেরা।
নগরবাসী জানান, বেলা আড়াইটায় নগরীর প্রবর্তক ও মুরাদপুর এলাকার সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোমর থেকে বুক পর্যন্ত পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে নগরীর রহমতগঞ্জ, কাতালগঞ্জ, রাহাত্তারপুল, আগ্রাবাদ এলাকার সড়কে হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব সড়কে যানচলাচল একেবারেই কম। ফলে ভোগান্তি পড়েছে নগরবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পানি জমে দ্রুত পরিস্থিতি খারাপ হয়ে পড়ে। পানি নামতে দেরি হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। সাদিয়া জাহান নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী বলেন, আজ ইংরেজি ২য় পত্রের পরীক্ষা ছিল। হল থেকে বের হয়ে গাড়ি না পেয়ে হেঁটে হেঁটে মুরাদপুর আসলাম। এখানে তো হেঁটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নাই। কোমর পর্যন্ত ময়লা পানি।
নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা মমিনুল হক বলেন, চট্টগ্রামে সাধারণত এমন পানি দেখা যেত টানা তিন-চারদিন বৃষ্টি হলে। এখন দেখছি ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হচ্ছে। মুরাদপুরে জলাবদ্ধতায় আটকে পড়া উন্নয়নকর্মী তোফায়েলুর রহমান বলেন, যারা বৃষ্টি এবং সমুদ্রকে ভালোবাসেন, তারা চট্টগ্রামের মুরাদপুর চলে আসেন। এত পানি সমুদ্র না সড়ক বুঝার উপায় নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন দুলালের ভাষ্য, প্রবর্তক মোড়ের অদূরে বদনা শাহ মাজারের সামনের সড়কে জমে থাকা পানিতে আটকা পড়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। বেশ কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে সড়কের ওপরই পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেককে কোমরসমান, কোথাও কোথাও গলাসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। পানির কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
এ সড়কের পাশেই রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ফলে রোগী, স্বজন এবং জরুরি সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। প্রবর্তক মোড়ের হিজড়া খালের কালভার্ট এলাকায় মাটি ফেলে সংস্কারকাজ চলছে। যন্ত্রপাতিও রাখা হয়েছে সড়কের পাশে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি চলাচল ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। নগরবাসীর মতে, আসন্ন বর্ষা সামনে রেখে গত সপ্তাহ থেকে মাসব্যাপী নালা-খাল পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এর অংশ হিসেবে নগরের বিভিন্ন খাল ও নালা পরিষ্কারে তদারকি করছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
মঙ্গলবার বিকেলে পরিদর্শনকালে মেয়র ডা. শাহদাত হোসেন বলেন, নগরের নালা-নর্দমা ময়লার স্তুপে পরিণত হওয়াই জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বলেন, কিছু অসচেতন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দার কারণে নালাগুলো বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জনগণ সচেতন না হলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের সংস্কারকাজ এখনো চলমান রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী জানান, প্রবর্তক এলাকার পাশে সিডিএর উন্নয়নকাজের কারণে সাময়িকভাবে পানি চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।