কোরবানির পশুর হাট

ইজারার চেয়ে খাস কালেকশনে আগ্রহী চসিক!

  • নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ার অজুহাত
  • ভিন্ন কথা বলছেন ইজারাদাররা
  • মূলে রাজস্ব লুটপাটে নানা কারসাজির অভিযোগ
নিউজটি পড়েছেন: 1502
173
ইজারার চেয়ে খাস কালেকশনে আগ্রহী চসিক!
ফলো করুনFacebookWhatsAppMessengerYoutube
Google News Follow
Dainik Ishanঈশান প্রতিবেদক৮ মে, ২০২৬, ৮:০৬ AM

চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোরবানির পশুর হাট ইজারা নিয়ে চলছে নানা তামাশা। হাটগুলো ইজারা দেওয়ার চেয়ে খাস কালেকশনে আগ্রহী বেশি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। ইতোমধ্যে নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ার অজুহাতে নগরীর সবচেয়ে বড় দৃুটি স্থায়ী পশুর হাট সাগরিকা ও বিবিরহাট ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশন শুরু করেছে চসিক।

এছাড়া আসন্ন ঈদুল আজহায় আরও ৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে চট্টগ্রামে। যার তিনটি ইজারার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হলেও বাকি তিনটি চাপা পড়েছে চসিকের নানা কারসাজিতে। টেন্ডার আহ্বান করা পশুর হাট তিনটিও শেষ পর্যন্ত ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশনের ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ নগরীর হাট-বাজার সংশ্লিষ্ট ইজারাদারদের।

ইজারাদাররা অভিযোগ করছেন, চসিকের রাজস্ব বিভাগসহ এস্টেট শাখার কর্মকর্তারা পশুর হাট ইজারা নিয়ে নানা কারসাজির সাথে জড়িত। যার মাধ্যমে তারা পশুর হাটগুলো থেকে হাসিল আদায়ের টাকা লোপাটসহ স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব হরণের সুযোগ পাচ্ছে।

আগে নগরীর এই তিনটি স্থায়ী পশুর হাট ইজারা থেকে চসিক প্রতি বছর অন্তত ১০-১২ কোটি টাকা রাজস্ব পেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ক্রমেই ইজারার চেয়ে খাস কালেকশনে নেমেছে চসিক। যদিও খাস কালেকশনে রাজস্ব আহরণ তুলনামূলক কম। এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাসিল চুরি, কর্মীদের মজুরি, বাজার ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি দেখিয়ে লুটপাট।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীর মুরাদপুর বিবির হাট বাজার ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ও পোস্তার পাড় ছাগলের বাজার ১ কোটি ১৪ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছিল। আর সাগরিকা পশুর হাট ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশন করেছিল চসিক।

এর আগে সর্বশেষ ২০২০ সালে সাগরিকা পশুর হাট ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু খাস কালেকশনে এই পশুরহাট থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬ কোটি টাকারও কম। এরপরও সাগরিকা পশুর হাটের সাথে এবার বিবিরহাট ও পোস্তার পাড় পশুর হাট থেকেও খাস কালেকশনে শুরু করেছে চসিক।

সূত্র আরও জানায়, ইজারা না দিলেও খাস কালেকশনে পছন্দের ইজারাদার নিয়োগ দেয় চসিক। এই ইজারাদার মিলেমিশে পশুর হাট থেকে আদায় করা রাজস্ব নানা কারসাজি করে লুটপাট করে। ফলে সরকার প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে ইজারাদার, চসিকের রাজস্ব বিভাগ ও এস্টেট শাখার কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ায় নগরীর স্থায়ী পশুর হাটগুলো থেকে খাস কালেকশনের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করছে চসিক। তবে আসন্ন ঈদুল আজহার অস্থায়ী পশুরহাটগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী পশু বাজার, মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ এবং ওয়াজেদিয়া মোড় পশুর হাট ইজারা দিতে সিলমোহরযুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

তিনি জানান, হাটগুলোর জন্য আগামী ১১ মে পর্যন্ত দরপত্রের ফরম সংগ্রহ করা যাবে। ১২ মে দুপুর ১টার মধ্যে দরপত্র জমা দিতে হবে। একই দিন বেলা দেড়টায় দরপত্র খোলা হবে। প্রস্তাবিত দামের ৩০ শতাংশ জামানত পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। অনুমোদনের পর বাকি ৭০ শতাংশ অর্থের সঙ্গে প্রযোজ্য কর ও ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে।

তিনি বলেন, এখন তিনটি হাটের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পরে আরও করা হতে পারে। বিষয়টি মেয়রের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। নিজস্ব জায়গা হলেও সিটি কর্পোরেনের অনুমোদন ছাড়া নগরীর কোথাও পশুর হাট বসাতে পারবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরশেন(চসিক) এলাকায় স্থায়ী তিনটি ছাড়া এবার অনুমোদিত কোরবানির পশুর হাট বসবে ৯টি। তম্মধ্যে তিনটি পশুরহাটের টেন্ডার আহ্বান করা হলেও বাকি ছয়টি বসছে টেন্ডার ছাড়াই। এক্ষেত্রে টেন্ডারগুলো কোথায় বা কোন পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে তারও কোন হদিস মিলছে না। এ সুবাধে তিনটি পশুর হাটও ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশনের দিকে চুক্তিতে যাচ্ছে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অনুমোদনের বাইরেও আরও ১৪টি স্থানে কোরবানির পশুর হাট বসে। সেখান থেকে কোটি কোাটি টাকা হাসিল আদায় করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু এই অর্থ সরকারি রাজস্ব কোষাগারে জমা হয় কিনা তার কোন ইয়ত্তা নেই।

অননুমোদিত অবৈধ পশুর হাটগুলো হচ্ছে- বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার, কাজীর হাট, কর্নেল হাট, ফইল্যাতলি বাজার, ফিরিঙ্গিবাজার, হাজি আব্দুল আলী আর্কেট (বেইজমেন্ট), দেওয়ান হাট (বেইজমেন্ট), বকশির হাট, পাহাড়তলী কাঁচাবাজার, আনন্দবাজার, বিবিরহাট কাঁচাবাজার, কমল মহাজন হাট, নয়াহাট এবং বেপারীপাড়া কাঁচাবাজার।

অনুমোদিত পশুর হাটগুলো হলো নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কর্ণফুলী গরুর বাজার (নুর নগর হাউজিং এস্টেট), ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হোসেন আহম্মদ পাড়া টিএসপি মাঠ, একই ওয়ার্ডের মুসলিমাবাদ রোডে সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াজেদিয়া মোড়, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আউটার রিং রোডের সিডিএ বালুর মাঠ এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম হালিশহরের মুনির নগর আনন্দবাজারসংলগ্ন খালি জায়গা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এসব পশুর হাটের অনুমোদন দেয়। আসন্ন ঈদুল আজহার জন্য গত বৃহ¯পতিবার (৩০ এপৃল) বিশেষ শর্তে এই ছয়টি পশুরহাট বসানোর অনুমোদন দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

জেলা প্রশাসনের আদেশে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনসাধারণের চাহিদা ও পুলিশ কমিশনারের মতামতের ভিত্তিতে হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী চলতি মাসের ১৯ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত স¤পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে ১০ দিনের জন্য এসব হাট বসবে।

আর শর্তগুলো হচ্ছে- প্রধান সড়ক থেকে অন্তত ১০০ গজ দূরে হাট বসাতে হবে। কোনোভাবেই যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না। হাটের বাইরে বা সড়কে পশু রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভেটেরিনারি চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত ও বাজার এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শর্তও দেওয়া হয়েছে।

ইজারাদারদের শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, চসিকের স্থায়ী ও অনুমোদিত অস্থায়ী পশুর হাটের বাইরে কোরবানি উপলক্ষে যত্রতত্র পশুর হাট বসানোর সুযোগ নেই। প্রতিবছর আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে এ ধরনের অবৈধ পশুর হাট উচ্ছেদ করি। এবারও অভিযান চালানো হবে।

তিনি বলেন, অবৈধ পশুর হাটের কারণে শুধু যে চসিকের রাজস্ব বা ইজারাদার হাসিল আদায় থেকে বঞ্চিত হয় তা নয় একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, পেশি শক্তির প্রয়োগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যানজট সৃষ্টি, পশুর গোবর পরিষ্কার না করা, ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তাহীনতাসহ অনেক সমস্যা দেখা দেয়। বৈধ কোরবানির পশুর হাটে জাল বুথ শনাক্তকরণ মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা, পশু চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, গোখাদ্য সরবরাহ, গরু বাঁধার ছাউনি, পশুর গোবর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যা¤প ও টহল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করে। অবৈধ হাটগুলোতে এসব থাকে না।

প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চসিক পৌরকর, ট্রেড লাইসেন্স ফি, ভূমি হস্তান্তর কর, বিজ্ঞাপন কর, সপসাইন ফি, প্রমোদ কর, যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন ফি, এস্টেটসহ বিবিধ খাতে মোট রাজস্ব আহরণ করেছিল ৩৯৭ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার ২৬০ টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (৩০ এপৃল পর্যন্ত) চসিকের রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৮৪ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৮ টাকা।

ঈশান/প্রবি/বেবি

মন্তব্য করুন