চট্টগ্রামে পাঁচ ব্যাংকের শাখায় তালা দিলেন আমানতকারীরা

নিউজটি পড়েছেন: 1159
279
চট্টগ্রামে পাঁচ ব্যাংকের শাখায় তালা দিলেন আমানতকারীরা
নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় মানববন্ধন কর্সূচিতে আমনতকারীরা, ছবি- দৈনিক ঈশান
ফলো করুনFacebookWhatsAppMessengerYoutube
Google News Follow
Dainik Ishanঈশান প্রতিবেদক৪ মে, ২০২৬, ১:০৯ PM

ট্টগ্রামে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের পাঁচটি শাখায় আমানতকারীরা তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। হেয়ার কাট (মুনাফা কেটে রাখা) বাতিল ও লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে সোমবার (৪ মে ) সকালে নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত পাঁচটি শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

পরে আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে মানববন্ধন করেন আমানতকারীরা। কর্মসূচিতে কয়েকশ আমানতকারী অংশ নেন বলে জানান সিএমপির ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন খান। তিনি বলেন, ব্যাংক গ্রাহকদের কর্মসূচি ছিল বিকেল ৩টা পর্যন্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। আমানত ফিরে পেতে এর আগে খাতুনগঞ্জে চারটি শাখায় তালা দিয়েছিলেন আমানতকারীরা।

পুলিশ জানায়, সোমবার সকাল ১০টায় আগ্রাবাদ এক্সেস সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন আমানতকারীরা। সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে অবস্থান নেন আমানতকারীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শাখার সামনে বিক্ষোভ করছেন আমানতকারীরা। একপর্যায়ে সেখানে তালা দেন তাঁরা। এ সময় কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়েন। ব্যাংকের সামনে শতাধিক আমানতকারীকে আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।

আমানতকারীদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের জমানো অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত মেয়াদের আগেই আমানত ভাঙতে দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি ২০২৮ সালের আগে টাকা উত্তোলন সম্ভব নয় বলেও জানানো হচ্ছে।

তাদের আরও অভিযোগ, হেয়ার কাট পদ্ধতির মাধ্যমে আমানতের মুনাফা বা মূলধনের একটি অংশ কেটে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এ কারণে তারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে অংশ নেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গ্রাহকরা দ্রুত আমানতের পুরো টাকা ফেরত, মুনাফা কর্তনের সিদ্ধান্ত বাতিল এবং স্বাভাবিক লেনদেন চালুর দাবি জানান। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

আমানতকারীদের দাবি, হেয়ার কাট বা মুনাফা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং তাদের জমাকৃত অর্থ স¤পূর্ণভাবে ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত চালু করা, আমানত উত্তোলনে আরোপিত সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

বিক্ষোভের সময় কথা হয় কয়েকজন আমানতকারীর সাথে। সুলতানা নাসরিণ নামের এক আমানতকারী দৈনিক ঈশানকে বলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। এখন প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে পারছি না। সামনে কোরবানির ঈদ, কিন্তু টাকা না পেলে কোরবানি কীভাবে দেব? কোরবানি দিতে পারব না, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে। আমরা গ্রাহক হিসেবে এত ভোগান্তিতে আছি, অথচ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো দায়বদ্ধতাই যেন নেই।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমীর হোসেন বলেন, আমরা কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে রাখি বিশ্বাস করে। কিন্তু এখন সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে। কর্মকর্তারা এসির নিচে বসে বেতন নেয়, কিন্তু গ্রাহককে সম্মান দিতে পারে না। আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমরা আমাদের নিজের টাকাই তুলতে পারছি না। এর চেয়ে বড় দুর্ভোগ আর কী হতে পারে!

ব্যবসার মুনাফার টাকা ছেলেমেয়েদের জন্য ব্যাংকে রেখেছিলেন ফয়সল আমিন। তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু এখন সেই ব্যাংকই আমাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায় মন্দা, এখন ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।

এর আগে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হেয়ার কাট বাতিল ও লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে গত রবিবার সকালেও খাতুনগঞ্জে ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন আমানতকারীরা। পরে ব্যাংকটিসহ আরও তিন ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।

বিক্ষোভরত আমানতকারীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের সম্মতি ছাড়াই আমানতের ওপর মুনাফা কর্তন করা হচ্ছে। যা বিদ্যমান ব্যাংকিং নীতিমালা ও আইনের পরিপন্থী।

তারা বলেন, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে পুরো টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত স্বাভাবিক লেনদেন চালুর দাবি জানান তারা।

গ্রাহকদের দাবি, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমানতের ওপর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। নানা অজুহাতে ব্যাংকগুলো আমানত ফেরত না দেওয়ায় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়ে ব্যাংক দুটির শাখা ব্যবস্থাপককে কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, হেয়ারকাট ছাড়া আমানত নবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঈশান/প্রবি/সুম
● ট্রেন্ডিং:চট্টগ্রাম

মন্তব্য করুন